ফাগুনের এক মাতাল হাওয়ার দিনে প্রকৃতি যখন নবরূপে সাজার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক তখনই বাংলাদেশের শোবিজ পাড়ায় ওঠে শোকের মাতম। গুণী অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। সেদিন হুমায়ুন ফরীদির দেহান্তর হলেও তিনি বেঁচে আছেন এখনো অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে। এদিকে আবারও এসেছে বসন্ত, ফাগুনের আগুন লাগা রঙে সাজবে প্রকৃতি। শুধু এমন বসন্তে হুমায়ুন ফরীদি নেই। ‘এসডিও সাহেবকে আমি সামলাব, আমার নাম হচ্ছে কাজী মোহাম্মদ রমজান- এ সুচতুর উক্তিটি সংশপ্তক নাটকে ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রের কুটিল ব্যক্তি হুমায়ুন ফরীদির। এক সময় বিটিভিতে প্রচারিত বিখ্যাত ‘সংশপ্তক’ নাটকে ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন তিনি। এ নাটকটিকে তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজও বলা যায় না। তবুও সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র হিসেবে বেশির ভাগ মানুষই বোধহয় কানকাটা রমজানকেই পছন্দ করবেন। ভয়ংকর কুটিল, ধুরন্ধর এবং একই সঙ্গে কিছুটা কমেডি ধাঁচের রমজান চরিত্রটি ফরীদি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তার কোনো তুলনা হতে পারে না। ব্ল্যাক কমেডির স্বার্থক চিত্ররূপ বলা যেতে পারে নাটকে তাঁর অংশটুকুকে।
সে সময় ফরীদি একাই টিভি নাটকের জনপ্রিয়তার সিংহাসন দখল করেছিলেন। আসলে ফরীদির সামনে নিষ্প্রভ মনে হতো সবাইকে। ছন্নছাড়া স্বভাবের জন্য ফরীদিকে ‘পাগলা’, ‘সম্রাট’, ‘গৌতম’ নানা নামে ডাকা হতো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি বিশিষ্ট নাট্যকার সেলিম আল দীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। সেলিম আল দীনের ‘সংবাদ কার্টুন’-এ একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করে ফরীদি মঞ্চে উঠে আসেন। অবশ্য এর আগে ১৯৬৪ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে কিশোরগঞ্জে মহল্লার নাটক ‘এক কন্যার জনক’-এ অভিনয় করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায়ই তিনি ঢাকা থিয়েটারের সদস্য পদ লাভ করেন। মঞ্চে তিনি ছিলেন সুঅভিনেতা। তিনি প্রচুর নাটকে অভিনয় করেন। নব্বইয়ের গোড়া থেকেই হুমায়ুন ফরীদির বড় পর্দার লাইফ শুরু হয়। বলা হয়ে থাকে, শুটিংস্থলে অভিনেতার তুলনায় দর্শকরা হুমায়ুন ফরীদির দিকেই আকর্ষিত হতো বেশি। নেগেটিভ চরিত্রে তাঁর দুর্দান্ত অভিনয় দেখে চিত্র পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন ১৯৯১ সালে ‘সন্ত্রাস’ চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে অভিনয়ের আমন্ত্রণ জানান। এরপর ফরীদি টেলিভিশনকে লম্বা সময়ের জন্য বিদায় জানিয়ে চলচ্চিত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নায়ক-খলনায়ক দুই চরিত্রেই তিনি ছিলেন সাবলীল, এক কথায় ভার্সেটাইল। এক সময় মানুষ আর নায়ককে নয়, এক ভিলেনকে দেখতেই হলে যেতেন সবাই। যদিও বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচালকরা তাঁর প্রতিভার কোনো ব্যবহারই করতে পারেননি। চলচ্চিত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে টিভির এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘বাণিজ্যিক ছবির অভিনেতার কাজ হচ্ছে ছবিটাকে বিক্রয়যোগ্য পণ্য করে তোলা। তাই সেখানে কারেক্ট অভিনয়ের দরকার নেই।’ হুমায়ুন ফরীদির স্মৃতি রোমন্থন করে তাঁর বন্ধু বিখ্যাত জাদুকর জুয়েল আইচ বলেন, ‘ফরীদির তখনো পয়সাপাতি হয় নাই। একদিন আমাকে দাওয়াত করল। তখন সে থাকত ভিকারুন নেসা স্কুলের উল্টোদিকের একটি ছোট্ট বাসায়। বলল, বন্ধু! তুমি আমার বাসায় আসবে, একসঙ্গে খাব। তুমি কী খেতে পছন্দ কর? বললাম, কী খাব! সবই তো খাই। সে বলল, তবুও বল। বললাম, মাছ আর ডাল হলে মহাখুশি। তারপর নির্দিষ্ট দিনে গেলাম, প্রচুর আড্ডা হলো। এরপর খাবারের জন্য ডাকল কাজের ছেলেটি। ওমা, গিয়ে তো চোখ উপরে ওঠার মতো অবস্থা! এমন কোনো মাছ নেই যে সে দুটো খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখেনি। এর মধ্যে এমন মাছও আছে যেগুলো আমরা ছোটবেলায় কাদার মধ্যে ধরতাম। বললাম, একি করছ পাগল? সে বলল, বন্ধু তুমি তো বলেছ মাছ খেতে পছন্দ কর, তাই এ আয়োজন। পরে জেনেছি, সে ভোর রাতে ওঠে ঢাকা শহরে সব জায়গা ঘুরেছে। যত মাছ দেখেছে তা থেকে কিছু কিছু কিনেছে।’ একান্ত ব্যক্তিজীবনে অসম্ভব অভিমানী এ শিল্পী জীবনকে পিষে-ঘষে-পুড়িয়ে জীবন ধরার চেষ্টা করে গেছেন। এখনো চোখ মুদলে তাঁর অট্টহাসিতে কাচ ভাঙার শব্দ শুনি।