নন্দিত নাট্যজন আবুল হায়াত। একাধারে তিনি একজন স্বনামধন্য অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক। কলাম ও বই লেখালেখির কাজেও দারুণ দক্ষ তিনি। নিজেকে ছড়িয়েছেন দুই হাতে; প্রতিটি ক্ষেত্রে বীরদর্পে ছুটে চলেছেন সমানতালে। এই দুরন্তযুবা কখন যে ৮০টি বসন্ত পেরিয়ে এসেছেন তা বোধহয় নিজের কাছেও অজানা! এ তারকার বর্তমান খবর জানাচ্ছেন- পান্থ আফজাল
অনেক অনেক ভালো আছি। শারীরিকভাবে খুবই স্ট্রং আছি। কাজ করছি নিয়মিত। শুটিং করে যাচ্ছি এখনো। শুটিং কিন্তু বন্ধ করি নাই। গুণী তারকা আবুল হায়াতের সঙ্গে কথা হতেও এমন উচ্ছ্বসিতভাবে নিজেকে প্রকাশ করলেন। কথার রেশ ধরে তিনি বলে চললেন, ‘আসলে অসুখের সঙ্গে ফাইট করে কাজ করে যাচ্ছি। আমি চাই, আমাকে দেখে যেন মানুষ ইন্সপায়ার হোক। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে শিখুক। আরও বেশি উদ্যমী হোক। একজন মানুষ যদি আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়, সেটাই আমি খুব করে চাই। আর আমি খুবই সৌভাগ্যবান যে, আমার প্রতিমুহূর্তের এই বেঁচে থাকার অক্সিজেন হিসেবে রয়েছেন আমার সহধর্মিণী ও ফ্যামিলি মেম্বার। প্রতি মুহূর্তে তারা আমাকে হেল্প করছে। আমার পাশে আছে।’ বয়সকে তুড়ি মেরে তিনি আরও জানালেন, ‘আমি কিন্তু ৮০ পার করেছি। সুস্থ আছি। এখনো একইভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এটা অবশ্যই সবার দোয়ায়।’ কথায় কথায় এই শ্রদ্ধেয়জন জানালেন নিজের আরও কিছু গল্প। ভ্রমণপ্রিয় এই তারকা প্রায়ই স্ত্রীকে নিয়ে উড়াল দেন নিউইর্য়কে, যেখানে মেয়ে বিপাশা, জামাই তৌকির আহমেদ ও তাদের সন্তানরা থাকেন। তাই নাতি-নাতনিকে দেখতে ছুটে যান নানু আবুল হায়াত ও নানি মাহফুজা খাতুন শিরিন। তিনি জানান, ‘এই ফেব্রুয়ারি মাসেই যাব, আমি আর আমার সহধর্মিণী।’ মেয়ে বিপাশা ভালো আছে। আরেক মেয়ে নাতাশা ও জামাই শাহেদ শরীফও ভালো আছে। নিজের স্ত্রীর বিষয়ে বললেন, ‘সে ভালো আছে। আমার পাশে আছে সবসময়।’ এদিকে প্রতিবারে একুশের বইমেলায় থাকে আবুল হায়াতের লেখা বই। এবারও ব্যতিক্রম নয়। তিনি বললেন, এবার আমার ‘রবিপথ’ এর সেকেন্ড এডিশন আসবে।’
শুটিং না থাকলে স্ত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন সুন্দর লোকেশনে ঘুরতে বেড়িয়ে যান। আর নয় সময় কাটান তাঁর সার্কিট হাউস রোডের বাসার ছয় তলার ফ্ল্যাটে। সেখানে বসার কক্ষে তাকজুড়ে থরে থরে সাজানো অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। চারদিকে শোভা পায় বিভিন্ন রকমের বই। রয়েছে এন্টিক শোপিসও। একাংশের দেয়ালজুড়ে রয়েছে পরিবারের সুন্দর মুহূর্তের বাঁধাই করা ছবি। সাজানো-পরিপাটি ফ্ল্যাটে এই সুখী মানুষের সুখের আয়োজন বলা যেতে পারে। দুরন্ত যুবা এই নাট্যজনের শৈশব ও বেড়ে ওঠা মুর্শিদাবাদে। তিনি স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, ‘জন্মটা মুর্শিদাবাদে। তিন বছর বয়সে অর্থাৎ ’৪৭-এর ডিসেম্বরে আমি এসেছি। চট্টগ্রামের রেলওয়ে কলোনিতে আমার বেড়ে ওঠা। এই শেষ বয়সে এসে যে নস্টালজি আমাকে সব সময় তাড়া করে, স্মৃতিকাতর করে তার মধ্যে একটা হলো রেলগাড়ি আর অন্যটি হলো সমুদ্র। আসলে চট্টগ্রাম শহরের নাম শুনলেই আমি স্মৃতিকাতর হয়ে যাই। অমলেন্দু বিশ্বাসের মতো একজন অভিনেতাকে চোখের সামনে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করতে দেখেছি। তিনি হলেন আমার ইন্সপেরেশন। পরবর্তীকালে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেত যে আমি তার মতো হব।’ সে বয়সে তিনি অনেক মজার মজার খেলাধুলাও করতেন। ১০ বছর বয়সেই অভিনয়ে আসা। বন্ধু জামালউদ্দিন, মিন্টু একই পাড়াতে থাকতাম। সেই বয়সে বাড়ির পাশে চৌকি দিয়ে, শাড়ি-চাদর তার দিয়ে ঝুলিয়ে স্টেজ বানিয়ে, বাড়ির থেকে লাইট কানেকশন নিয়ে এসে আমরা সবাই মিলে আমার মামার ডিরেকশনে ‘টিপু সুলতান’ নাটক করি। সেটিই আমার জীবনের প্রথম নাটক ছিল। পরে ক্লাস টেনে পড়ার সময় ‘কলির জ্বিন’ নামে একটি নাটক করলাম। একবার আমাদের পাড়াতে নাটক করলাম। আমাকে হিরোর চরিত্র দিল; ছোটবেলায় চেহারা নাকি সুন্দর ছিল। যদিও আমি লজ্জায় হিরোর পাট করলাম না, করলাম ছোট্ট একটি ভিলেনের পাট। সেই চরিত্র করেও তখন ফাটিয়ে দিলাম। এরপর থেকেই নাটকের প্রতি একটা নেশা ধরে গেল এবং একসময় মজাটা আরও বাড়তেই থাকল। যখন থার্ড ইয়ারে পড়ি তখন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আমরা ক’জনা’-এর সঙ্গে যুক্ত হই। বুয়েট পাস করে ওয়াসার সরকারি চাকরিতে যুক্ত হলাম ১৯৬৮-এর দিকে। এ সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংসদ নামে একটি সংগঠন ছিল। ওরা যেন কেমন করে আমাকে খুঁজে বের করল। ড. ইনামুল হকের মাধ্যমে আমাকে খুঁজে বের করেছিল। এরপর ’৬৮-এর শেষের দিক থেকে ’৬৯, ৭০ ও ৭১-একটা দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম। আমরা শহীদ মিনারে, জহুরুল হক হলে, মহসীন হলে, জগন্নাথ হলের অডিটরিয়ামে নাটক দিয়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে গেলাম।১৯৭০ সালে নিজের পছন্দেই বিয়ে করি মাহফুজা খাতুন শিরিনকে। ৬৮-এ বুয়েটে পাস করার পর নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হই। এখনো মঞ্চ, রেডিও, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করছেন তিনি।