সময়টা প্রায় সন্ধ্যা, নার্গিস হেঁটেই বাড়ির পথে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামল। আর কোনো উপায় নেই, পথের ধারে দাঁড়িয়েই ভিজছিলেন নার্গিস। সেই পথে যাচ্ছিলেন পথিক রাজ কাপুর। নার্গিসের দিকে এগিয়ে এলেন তিনি। নার্গিসের মাথার ওপর ছাতা ধরলেন। দুজন ছাতার নিচে কাছাকাছি এলেন। নার্গিসের চোখেমুখে লজ্জার ছাপ স্পষ্ট। রাজ কাপুর গেয়ে উঠলেন...‘পেয়ার হুয়া একরার হুয়া, পেয়ারসে ফের কিউ ডরতা হ্যায় দিল।’ এমন প্রেম নিবেদনে শঙ্কিত নার্গিস জবাব দিলেন... ‘ক্যাহেতা হে দিল রাস্তা হে মুশকিল, মালুম নেহি হ্যায় কাহা মঞ্জিল...। তারপর তাঁরা সব ভয় পেছনে ফেলে হাতে হাত রেখে এগিয়ে চললেন ভালোবাসার পথ ধরে। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পাওয়া রাজ কাপুর পরিচালিত ও রাজ-নার্গিস অভিনীত ‘শ্রী ৪২০’ ছবির দৃশ্য এটি। এ দৃশ্যই পরবর্তীতে দুজনার বাস্তব জীবনে সত্যি হলো। তারপরও কেন ব্যর্থ প্রেমের ইতিহাস হয়ে রইলেন এ দুই বলিউড সেনসেশন।
১৯৪৯ সালে প্রথম মুক্তি পায় রাজ কাপুর-নার্গিস অভিনীত ছবি ‘আন্দাজ’। এতে এ জুটির সাফল্য আকাশ ছুঁয়ে যায়। এরপর রাজ কাপুর তাঁর নিজস্ব চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আর কে ফিল্মসের ব্যানারে নার্গিসের সঙ্গে জুটি বেঁধে একে একে নির্মাণ করেন ‘বারসাত’ (১৯৪৯), আওয়ারা (১৯৫১), ‘শ্রী ৪২০’ (১৯৫৫), ‘চোরি চোরি’ (১৯৫৬)। প্রতিটি ছবিই সুপার-ডুপার হিট হয়। ছবিতে পর্দায় তাঁদের রসায়ন ছিল অনন্য। একসঙ্গে কাজ করতে করতেই নার্গিসের সঙ্গে প্রেম গড়ে ওঠে রাজের। শুটিংয়ের ফাঁকে কিংবা অবসরে তাঁরা ছিলেন পরস্পরের সঙ্গী। রাজের ওপর দারুণভাবে নির্ভর করতেন নার্গিস। আর রাজও ছবির গল্প স্থির করতেন নার্গিসের কথা মাথায় রেখে। বিদেশে তাঁরা হোটেলের একই কক্ষে থাকতেন স্বামী-স্ত্রীর মতো। বিদেশে মিসেস কাপুর হিসেবে পরিচিত হন নার্গিস। ১৯৪৯ সালে তাঁরা গোপনে বিয়ে করেন। অবশ্য আইনগতভাবে নয়, মন্দিরে গিয়ে। নার্গিসের গলায় মঙ্গলসূত্র পরিয়ে দেন রাজ। ১০ বছর গভীর প্রেমের পর ভাঙনের সুর বাজে তাঁদের সম্পর্কে। সম্পর্ক ভাঙার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল। নার্গিস আশা করেছিলেন তিনি হবেন রাজ কাপুরের ঘরণী। কিন্তু রাজ ছিলেন বিবাহিত। ১৯৪০ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পারিবারিকভাবে আত্মীয় কন্যা কৃষ্ণাকে বিয়ে করতে বাধ্য হন রাজ। কৃষ্ণা কাপুর ছিলেন ঘরোরা প্রকৃতির নারী, সাদামাটা কৃষ্ণাকে ‘শো ম্যান’ রাজের পাশে একেবারেই মানাত না। কিন্তু রাজের পক্ষে অসম্ভব ছিল কৃষ্ণাকে ত্যাগ করা। কারণ যৌথ পরিবারের সন্তান রাজ পারিবারিক ঐতিহ্যের বাইরে গিয়ে, বিশেষ করে বাবার নির্দেশকে অমান্য করে কৃষ্ণা এবং সন্তানদের ত্যাগ করতে অপারগ ছিলেন। নার্গিস বুঝতে পারছিলেন রাজের জীবনে দ্বিতীয় নারী হিসেবেই থাকতে হবে তাঁকে। পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝিতে তারা মস্কো যান। রাজ কাপুরের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, ফ্রান্স সব দেশে তাঁর জয়জয়কার। মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে বিপুল সম্মান পান রাজ কাপুর। নার্গিস লক্ষ্য করেন রাজের ছবিগুলোতে স্বয়ং রাজের ব্যাপক জনপ্রিয়তা, সবাই তাঁকে নিয়ে মেতে আছে। বিশেষ করে নারীভক্তরা রাজকে ঘিরে রয়েছে। রাজও যেন তাদের দিকেই বেশি মনোযোগী। অথচ সহশিল্পী হিসেবে তাঁরও তো অনেকটা কৃতিত্ব রয়েছে এ ছবিগুলোর সাফল্যের পেছনে। কিন্তু তাঁকে তেমন কেউ চিনতেও পারছে না বা খুব একটা গুরুত্বও দিচ্ছে না। এতে আহত হন তিনি। মস্কোতে এ নিয়ে রীতিমতো মনোমালিন্য হয় তাঁদের। নার্গিসের মনে হতে থাকে রাজের জীবনে তাঁর স্থান কোথায়? রাজের ছবিগুলোতেও নায়ক চরিত্রেরই প্রাধান্য। নায়িকা সেখানে অনেকটাই শোপিস। এ নিয়ে বেশ রাগারাগি হয় তাঁদের মধ্যে। অভিমান করে মস্কো থেকে একা ফিরে আসেন তিনি। এদিকে রাজ তখন জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হোটেলের রুমে পড়ে আছেন। সে সময় অসুস্থ রাজের সেবা করে তাঁর মন জয় করেন দক্ষিণের নৃত্যকুশলী নায়িকা পদ্মিনী। কৃতজ্ঞ রাজ দেশে ফিরে নতুন সিনেমা বানালেন ‘জিস দেশ মে গঙ্গা বেহতি হ্যায়’। তাতে নার্গিসের পরিবর্তে নায়িকা হলেন পদ্মিনী। রাজের আরেকটি সফল ছবি ‘সংগম’-এ নায়িকা হন গ্ল্যামারার্স বৈজয়ন্তী মালা। এমনকি ছবিটির সাফল্যের স্বার্থে রাজ-বৈজয়ন্তীর রোমান্সের গুজব বাণিজ্যিক কৌশল হিসেবে ছড়িয়ে দেন রাজ নিজেই। এতে আরও ক্ষুব্ধ হন নার্গিস। সে সময় নতুন ছবির শুটিং চলছে। মেহেবুব খানের ‘মাদার ইন্ডিয়া’র। এতে মূল ভূমিকায় নার্গিস। তাঁর ছেলের ভূমিকায় রয়েছেন সুনীল দত্ত। এক দিন ছবির সেটে আগুন লাগে। নিজের জীবন বাজি রেখে নার্গিসকে বাঁচান সুনীল। এরপর সুনীল দত্তের সঙ্গে নার্গিসের রোমান্সের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে আহত হন রাজ। এক দিন আর কে ফিল্মসের স্টুডিওতে দুজনের কথা কাটাকাটি হয়। এ স্টুডিওতে নার্গিসের জন্য ছিল আলাদা কক্ষ। সেখানে অনেক ব্যক্তিগত জিনিস রাখতেন তিনি। ঝগড়ার পর তাঁর গাড়ির ড্রাইভার এসে যখন সেসব জিনিস নিয়ে যাচ্ছিল তখন রাজ অভিমানে উদ্বেল হয়ে ওঠেন। তিনি বুঝতে পারেন নার্গিস চলে যাচ্ছেন তাঁর জীবন থেকে চিরতরে। সুনীল দত্ত নার্গিসকে ভীষণ ভালোবাসতেন। নার্গিস ভাবলেন রাজের জীবনে ছায়ামাত্র হয়ে থাকার চেয়ে সুনীল দত্তের মতো একজন আদর্শ মানুষের স্ত্রী হওয়া শতগুণে শ্রেয়। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পেল ‘মাদার ইন্ডিয়া’। ছবিটি নার্গিসের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজই শুধু নয়, এটি হিন্দি সিনেমার শতবর্ষের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ছবি। নার্গিসের জীবনে এটি বয়ে আনে প্রভূত সম্মান ও সাফল্য। পরের বছর ১৯৫৮ সালেই সুনীল দত্তকে বিয়ে করেন নার্গিস। নার্গিসকে হারানোর বেদনা রাজকে সারা জীবনই বয়ে বেড়াতে হয়েছিল।
নার্গিসের মৃত্যু হয় ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধে ১৯৮১ সালে মাত্র ৫১ বছর বয়সে। আর বলিউড কিংবদন্তি রাজ কাপুর ১৯৮৮ সালে ৬৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। জীবনে তাঁরা একে অন্যের না হতে পারলেও রাজ-নার্গিস চিরদিনই বলিউডের অন্যতম সেরা প্রেমিক জুটি হিসেবে দর্শকহৃদয়ে আসন গেড়ে রইলেন।