বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি সারা দেশে ছবি মুক্তি ও প্রদর্শনের বিষয়ে নতুন নিয়ম চালু করতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি রিলিজ সাব কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে প্রদর্শক সমিতি। গত ২১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সমিতির বিশেষ সাধারণ সভায় বিদ্যমান ব্যবসায়িক সংকটের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা সুদীপ্ত দাস এ প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতিতে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত নেতৃত্ব না থাকায় চলচ্চিত্র ব্যবসায় বিরাজমান যে কোনো সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
রিলিজ সাব কমিটি গঠনে পেছনের ইতিহাস টানতে গিয়ে সুদীপ্ত কুমার দাস তাঁর প্রস্তাবে উল্লেখ করেন যে, ১৯৮৩ সালে এফডিসির উদ্যোগে সম্পাদিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় রিলিজ সাব কমিটি গঠন করা হয় প্রযোজক সমিতি, পরিবেশক সমিতি এবং প্রদর্শক সমিতির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে। ২০০২ সালে প্রযোজক সমিতি একতরফাভাবে প্রদর্শকদের বাদ দিয়ে একক নেতৃত্বে রিলিজ কমিটি গঠন করে ছবি মুক্তির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এ বিষয়ে উভয় সমিতির নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টিও শাখায় প্রদর্শক সমিতির পক্ষ থেকে আবেদন জানালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উভয় সমিতির মধ্যে যৌথ আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শন ব্যবসা পরিচালনায় একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম চালু করার জন্য উভয় সমিতিকে নির্দেশনা দেয়। কিন্তু এর কিছুদিন পর প্রযোজক সমিতিতে প্রশাসক নিয়োগ করায় বিষয়টি আর এগোয়নি। গত বেশ কয়েক বছর ধরে প্রযোজক সমিতিতে ক্রমাগতভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। রুটিন কার্যক্রমের বাইরে তারা নীতিগত কোনো সিদ্ধান্তে যেতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এতে নতুন ছবির মুক্তির বিষয়টিসহ আরও কিছু চলচ্চিত্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে প্রদর্শকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রযোজক পরিবেশকরাও এ ক্ষতির বাইরে নয়। এ অবস্থায় চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির বিশেষ সাধারণ সভায় লায়ন সিনেমাসের কর্ণধার প্রদর্শক মির্জা আবুল খালেককে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি রিলিজ সাবকমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি গঠন ও এর সম্ভাব্য কার্যপরিধি সম্পর্কে প্রযোজক পরিবেশক সমিতির প্রশাসক, এফবিসিসিআই এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠনের মহাপরিচালক (ডিজি) অফিসকে অচিরেই অবগত করবে প্রদর্শক সমিতি। এ ছাড়া প্রদর্শক সমিতির সব সদস্যকেও বিষয়টি জানানো হবে বলে সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এদিকে প্রদর্শকরা বলেন, দর্শকের অভাবে নব্বই দশকের শেষ ভাগে দেশে থাকা প্রায় ১ হাজার ২৩৫টি সিনেমা হল বন্ধ হতে হতে এখন অর্ধশতের ঘরে এসে ঠেকেছে। সম্প্রতি দেশের সিনেমা হল ও সিনেপ্লেক্সের মালিকরা এক বৈঠকে মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন নিয়মিতভাবে মানসম্মত ও পর্যাপ্ত পরিমাণে দেশীয় ছবি না পেলে এবং সরকার বছরে সীমিত আকারে উপমহাদেশীয় ছবি আমদানির ফের অনুমতি না দিলে সিনেমা হল মালিকরা দেশের সব সিনেমা হল ও সিনেপ্লেক্স বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। কারণ বছরের পর বছর ছবি ও দর্শকের অভাবে লোকসান গুনতে গুনতে হল মালিকদের পিঠ অনেক আগেই দেয়ালে ঠেকে গেছে।
চলচ্চিত্র প্রদর্শকরা বলেন, সবারই বোঝা উচিত সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেলে সমাজে কমপক্ষে দুটি ক্ষতি হবে। যা ইতোমধ্যে হওয়া শুরুও করেছে। এখন এ ক্ষতি হবে আরও দীর্ঘমেয়াদি। সিনেমা হলের অভাবে সস্তায় বিনোদনের উপকরণের সুযোগ না থাকায় যুব সমাজের একাংশ মাদক সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছে। যার ক্ষতিকর প্রভাব রাষ্ট্র এবং সমাজ ভালোভাবেই উপলব্ধি করছে। পাশাপাশি আরেকটি শ্রেণি ধর্মীয় মৌলবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সামাজিক অবস্থায় সিনেমা হল বন্ধ হলে আরও ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এ সময়ে আমরা যেখানে গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডে বসবাস করছি, প্রতিনিয়ত সমাজের সম্পন্ন মানুষ দেশ-বিদেশের ছবি দেখার সুযোগ পাচ্ছে, শহরের অভিজাত ক্লাবগুলোতে রীতিমতো বড় পর্দা টানিয়ে সদস্যদের আনসেন্সর্ড ছবি দেখানো হচ্ছে। পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফরমের নামে টিভি ও স্মার্টফোনে যে কোনো ছবি দেখার সুযোগ পাচ্ছে তখন শুধু ভারতীয় ছবি আমদানির ক্ষেত্রে কোনো প্রকার নেতিবাচক সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করছে প্রদর্শকসহ সবাই। সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর কাছে সবার প্রশ্ন-দেশের সিনেমা হল/সিনেপ্লেক্স বন্ধ হয়ে গেলে ওনাদের ছবিগুলো চালাবেন কোথায়? কারণ হিসেবে প্রদর্শকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, ফারুকী উপদেষ্টা হওয়ার পর হঠাৎ করে ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানির বিপক্ষে অবস্থান নেন। তাই দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচানোর জন্য ছবি মুক্তি ও প্রদর্শনের নতুন ব্যবস্থা চালুসহ নানা উদ্যোগ নেবে প্রদর্শক সমিতি, জানিয়েছেন সমিতির কর্মকর্তারা।