প্রবীর মিত্রকে রিকশা চালাতে বলেছিলেন তাঁর স্ত্রী। জীবদ্দশায় বেশ কবছর আগে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটিই জানিয়েছিলেন সদ্যপ্রয়াত এ অভিনেতা। গত রবিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রের এ নায়ক। প্রবীর মিত্র সেদিন কর্মজীবনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছিলেন, আমি ছিলাম চলচ্চিত্র ও অভিনয়পাগল একজন মানুষ। সত্তর ও আশির দশকে প্রচুর ছবির কাজ আমার হাতে। সকাল থেকে দুপুর, বিকাল গড়িয়ে কখন সন্ধ্যা আর রাত হতো টেরই পেতাম না। কাজ আর কাজ। মাঝে মাঝে কাজের চাপে দিনের পর দিন বাসায় যাওয়ারও সময় পেতাম না। সন্তানদের নিয়ে আমার স্ত্রী বাসায় একা থাকতেন। এক দিন অনেক রাতে শুটিং শেষ করে বাসায় ফিরেছি। স্ত্রী আমাকে ভাত খেতে দিয়ে পাশে বসল। মুখে কোনো কথা নেই। যেন তার মুখজুড়ে অমাবস্যা ভর করেছে। এর কারণটা অবশ্য আমার কাছে সহজেই বোধগম্য। সব স্ত্রীই চায় তাঁর স্বামী তাঁকে ও সন্তানদের সময় দিক। তাই নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হলো। তারপরও কিছুটা সাহসে ভর করে তাঁকে বললাম, তোমার শরীর ভালো তো। এবার যেন আমার কথায় তাঁর অভিমানের প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ ঘটল।
কান্না জড়ানো কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি রিকশা চালাতে পার না।’ তাঁর কথায় চমকে উঠলাম। ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলাম কেন, কী হয়েছে? পরক্ষণেই এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘আরে রিকশাওয়ালাদেরও তো কাজ সেরে বাসায় ফেরার একটা টাইম থাকে। তোমার তো তাও নেই। কখনো কখনো রাতে ফের, আবার ভোরে বাচ্চারা ঘুম থেকে ওঠার আগেই চলে যাও, তাই বাবা কী জিনিস বাচ্চারা বুঝতেই পারছে না।’ বলতে বলতে তাঁর গণ্ড গড়িয়ে অশ্রু বেয়ে পড়ছিল। তাঁর কষ্টটা আমি বুঝতে পারছি, তাই তাঁকে আর মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়ার অজুহাত খুঁজিনি। এরপর অবশ্য সে বুঝতে পেরেছে কাজের প্রতি আমার দায়িত্বের নেশা। তাই কখনো আর কিছু বলেনি। আমি অভিনয় নিয়ে ছুটে বেড়াতাম আর ও একাই সংসার-সন্তান সামলাত। ওর এই সহযোগিতা পেয়েছিলাম বলেই আমি অভিনেতা প্রবীর মিত্র হয়ে উঠতে পেরেছিলাম।
অভিনয়পাগল
১৯৪৩ সালের ১৮ আগস্ট কুমিল্লার চান্দিনায় জন্ম হয় প্রবীর মিত্রের। তাঁর বড় হওয়া পুরান ঢাকায়, তিনি স্কুলজীবন থেকেই নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্কুলজীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সিনেমার দুনিয়ায় তাঁর পথচলা শুরু ১৯৬৯ সালে প্রয়াত এইচ আকবরের ‘জলছবি’ ছবির হাত ধরে। ১৯৭১ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। ৫৫ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রবীর মিত্র ‘নায়ক’ হিসেবে হাতেগোনা সিনেমাতেই অভিনয় করেছেন, প্রকৃতপক্ষে অভিনেতা হিসেবে তাঁকে নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল যখন তিনি পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতে অভিনয় করেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণ রচিত উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অবলম্বনে নির্মিত এ ছবিতে কিশোর চরিত্রে অভিনয় করে নজর কেড়েছিলেন প্রবীর মিত্র। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক দলিল হয়ে রয়েছে ঋত্বিক ঘটকের এ ছবি।
যেভাবে মুসলিম হলেন
প্রবীর মিত্র অভিনয় জগতে আসার পর সনাতন ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন। সেই সময়ের এক ভিডিওতে প্রবীর মিত্রকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি তো কনভার্ট হয়েই অজন্তাকে (স্ত্রী) বিয়ে করেছিলাম। তখন মুসলমান হয়েছিলাম। তখন প্রয়োজন হয়েছিল মুসলমান হওয়া। ধর্ম নিয়ে প্রবীর মিত্রের ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধর্ম নিয়ে আমার কোনো বাড়াবাড়ি নেই। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। উল্লেখ্য, প্রবীর মিত্র ১৯৭২ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন মুসলিম মেয়ে সেলিনা হোসেনকে। তখন প্রবীর মিত্র মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে নাম রাখেন হাসান ইমাম। অবশ্য বিয়ের পর স্ত্রীর নাম সেলিনা পরিবর্তন করে রাখা হয় অজন্তা মিত্র। তিনি ২০০০ সালে মারা যান। মূলত স্ত্রীর অকাল মৃত্যুর পরপরই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন প্রবীর মিত্র। এ দম্পতির তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তারা হলেন, মিঠুন মিত্র, ফেরদৌস পারভীন, সিফাত ইসলাম ও সামিউল ইসলাম। ছোট ছেলে সামিউল ২০১২ সালে ৭ মে মৃত্যুবরণ করেন।
চলচ্চিত্র জীবন
প্রবীর মিত্র সর্বশেষ প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ চলচ্চিত্রে। পরবর্তী সময় তিনি চরিত্রাভিনেতার দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। ১৯৮২ সালে তিনি ‘বড় ভালো লোক ছিল’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রে অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া দুবার পার্শ্বচরিত্রে বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১৮ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পান। প্রায় ৩ শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেন প্রবীর মিত্র।
অন্তিম শয়ন
গতকাল বাদ জোহর এফডিসিতে ও এরপর টিভি চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে নামাজে জানাজা শেষে প্রয়াত অভিনেতা প্রবীর মিত্রকে আজিমপুর কবরস্থানে অন্তিম শয়নে শায়িত করা হয়।