তিয়াত্তর বছর আগে বাংলা ভাষার জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পটভূমি-প্রেক্ষাপট একই। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিন সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মিছিল করার সময় পুলিশের গুলিতে যাঁরা শহীদ হন তাঁদের অন্যতম শহীদ আবুল বরকত (১৯২৭-৫২)। সেদিন আনুমানিক বেলা ৩টার সময় ছাত্র-জনতার সঙ্গে সংঘর্ষ তীব্র হয়ে উঠলে পুলিশ কোনো সতর্কতা ছাড়াই গুলি ছুড়লে মর্মবিদারক এ ঘটনা ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় শুরু হওয়া সংঘর্ষ একসময় ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র হোস্টেলেও ছড়িয়ে পড়ে। আকাশবাতাস প্রকম্পিত ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে মুখর মিছিল ও সমাবেশে পুলিশ অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রদের ওপর। চলতে থাকে পুলিশের বুলেট বনাম ছাত্রদের ইটের লড়াই।
একসময় ছাত্রদের প্রতিরোধ অতিক্রম করে পুলিশ ঢুকে পড়ে হোস্টেলে এবং অতর্কিত গুলি ছুড়তে থাকে। হোস্টেলের ১২ নম্বর শেডের বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এমএর ছাত্র আবুল বরকত। তিনি লুটিয়ে পড়লেন, তাঁর তলপেটে লেগেছিল গুলি। তখন তাঁর গায়ে ছিল নীল রঙের হাওয়াই হাফ শার্ট, পরনে খাকি প্যান্ট, পায়ে কাবুলি স্যান্ডেল। সঙ্গীরা কাঁধে তুলে নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পথিমধ্যে পানি খেতে চাইলে, পানির অপ্রতুলতায় তাঁকে রুমাল চুষতে দেওয়া হয়। এ সময়ও বরকত সাহস হারাননি এবং আন্দোলন যেন স্তিমিত না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে বলেছিলেন- ‘খুব কষ্ট হচ্ছে, বাঁচব না। বিষ্ণুপ্রিয়া ভবন, পুরানা পল্টনে খবর পৌঁছে দেবেন।’
রাত ৮টার দিকে তিনি মারা যান। ওই দিন রাতে কড়া পুলিশি পাহারায় তাঁর আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। বরকতের মৃত্যুর ১১ বছর পর তাঁর মা হাসিনা বেগম ১৯৬৩ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। সচরাচর যেমনটি হয়ে থাকে, পরবর্তী সময়ে আবুল বরকতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানপন্থি, পুলিশের ইনফরমার, এমনকি ভারতীয় গুপ্তচর বলে মিথ্যা-ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছিলেন কেউ কেউ। তবে এটা সত্য যে বর্তমান ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মতো ভাষা আন্দোলনের শহীদ সালাম, বরকত, জব্বারদের রক্ত সমগ্র বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। বিক্ষোভকারী ছাত্রদের মধ্যে যেভাবে নিজের প্রাণ দিয়ে আন্দোলনের তীব্রতা সৃষ্টি ও আত্মমর্যাদার মূল্যবোধ জাগিয়ে একটা জাতির নির্মীয়মাণ ইতিহাসেন্ডেক গৌরবের শীর্ষে নিয়ে গেছেন। ফলে আজ বরকতরা বেঁচে আছেন একটা মুক্ত, স্বাধীন জাতির অগণন মানুষের অন্তরে, সংগ্রামশীল মাতৃভাষার ইতিহাসে। বরকতের আত্মত্যাগ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি এখন একটি বৈশ্বিক স্মরণীয় দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং ভাষার নামে পৃথিবীতে একমাত্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দেদীপ্যমান।
বর্তমানে ভারতভুক্ত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বর্ধিষ্ণু সালার অঞ্চলে এক সাধারণ পরিবারে আবুল বরকতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পাশেই বাবলা নদী, তাই তাঁর গ্রামের নামও বাবলা। ঘন সবুজ গাছগাছালি, বিস্তৃত কৃষিখেত, বাঁশবন, পুষ্করিণী আর সর্পিল মেঠোপথই বরকতের গ্রামকে অপার সৌন্দর্যে মেলে ধরছে। রাঢ় বাংলায় গ্রাম্য জীবনের অনাবিল মুক্ত আবহে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে। বাবা মৌলবি শামসুজ্জোহা শিক্ষিত জোতদার, মা হাসিনা বেগম। পিতৃব্য মুন্সি খোদা হাফেজ ছিলেন তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। সালার অঞ্চল রত্নগর্ভা। এখান থেকে জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৯১১-১৯৮৯), সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান লে. জেনারেল এম আতিকুর রহমান (১৯২৯-২০২৩), বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সৈনিক নেয়ামুল বাসির, তাঁর সুযোগ্য ভাই কথাসাহিত্যিক ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসবেত্তা বশির আল হেলাল, লোকগীতির প্রবাদপুরুষ আবদুল আলীম (১৯৩১-১৯৭৪) এর জন্মভূমি সালারের তালিবপুর গ্রামে। আবদুল আলীমের সঙ্গে বরকতের একটা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ! মুর্শিদাবাদে ভয়াবহ অবস্থা। মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানে না ভারতে যাবে, তা নিয়ে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। সবার ধারণা ছিল মুসলমান-অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ পাকিস্তানের মধ্যে যাচ্ছে। হলোও তা-ই। কিন্তু স্বাধীনতার তিন দিন পার হতেই আবার ভারতে এলো। জেলার মুসলমানদের আশা ভঙ্গ হলো। স্বাধীনতা ও দেশভাগের উত্তাল সেই পরিস্থিতিতে বহরমপুর শহরেও তখন সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বলেছিল। শিক্ষিত মুসলমানদের অনেকেই পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি দেন। দেশভাগ ও গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ১৯৪৮ সালে আইএ পাস করে বরকত ঢাকার জগন্নাথ কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হন এবং দ্বিতীয় বিভাগে চতুর্থ স্থান দখল করেন। ঢাকায় পড়ার সময় পুরানা পল্টনের বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে থাকতেন। ২১ ফেব্রুয়ারি বরকতের বাড়িতেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাড়ির কাউকে না জানিয়ে আকস্মিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন। বরকতের পরিবারের পক্ষ থেকে আন্দোলন বা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করার জন্য কঠোরতা ছিল। ঘটনার দিন হোস্টেলে তিনি তাঁর বন্ধু মোরশেদ নেওয়াজের সঙ্গে শুধু দেখা করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের আমতলায় ছাত্রবিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। মধুর ক্যান্টিনে বন্ধু হাসান হাফিজুর রহমানসহ অনেকেই তাঁকে আন্দোলনের পক্ষে পোস্টার লাগাতে দেখেছিলেন। বরকত মনেপ্রাণে ছিলেন ভাষা আন্দোলনের একনিষ্ঠ সমর্থক।
লেখক : সাবেক সচিব এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান