আজকাল বিশ্বাসীর সংখ্যা নাকি দ্রুত বাড়ছে। আস্তিক আর বিশ্বাসী, শব্দ দুটি সমার্থক। নাস্তিক আর অবিশ্বাসী একই কথা। বিশ্বাসী বাড়ছে মানে নাস্তিক কমছে? মনে তো হয় না। আমাদের দেশে বিশ্বাসী বা আস্তিক কে, যাচাই করার সময় ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ব্যবহৃত হয়। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার যিনি করেন তিনি আস্তিক। তিনি স্রষ্টায় বিশ্বাসী। যার ধারণা, সৃষ্টিকর্তা বলে কিছু বা কেউ নেই, তিনি নাস্তিক। তিনি অবিশ্বাসী। সব ধর্মেই সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করার উপদেশ রয়েছে। ব্যতিক্রম বৌদ্ধধর্ম। ধর্ম বলে, ভালো কাজ কর আল্লাহ তোমার ওপর খুশি হবেন। অন্যায় কাজ করবে না; করলে আল্লাহ নারাজ হবেন। পুণ্যবান হওয়ার তাগিদ দিয়ে ধর্মগুরুরা বলেন, পুণ্য অর্জন কর, অনেক পুণ্য। তাহলে স্রষ্টা তোমাকে স্বর্গে ঠাঁই দেবেন। পাপাচারী হইও না। স্রষ্টা পাপীদের পছন্দ করেন না। পাপ করলে নিক্ষিপ্ত হবে নরকে।
পণ্ডিত অধ্যাপক আবুল ফজল বৌদ্ধ ধর্মের সৌন্দর্য বর্ণনাকালে বলেছেন, এ ধর্মে নরকের ভয় দেখানো হয় না। স্বর্গের লোভ দেখানোর ব্যাপারও এতে নেই। মানুষ মন্দ কাজ করবে না, কারণ সে মানুষ- পশু নয়। মানুষ ভালো কাজ করবে কারণ সে মানুষ। সুকৃতি মানুষের পক্ষে শোভনীয়; দুষ্কৃতি তার জন্য বর্জনীয়। আফ্রিকার দেশে দেশে ইউরোপীয় ধর্ম ব্যবসায়ীরা ‘মিশন’-এর ছুতোয় সুচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হওয়ার প্রক্রিয়ায় যেসব জঘন্য ঘটনার জন্ম দেয়, তার বিশদ আমরা পেয়েছি আবুল ফজল রচিত এক নিবন্ধে।
ওই নিবন্ধে উদ্ধৃত হয়েছেন আফ্রিকান জাতীয়তাবাদী কয়েকজন নেতা যাঁরা বেলজিয়াম-ফ্রান্স-ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য জগদ্বিখ্যাত। এই নেতারা জানান মিশনারিরা প্রচার করে, খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলে ঈশ্বর তোমার খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা করবেন। তোমার ‘সন্তানের জন্য উন্মুক্ত হবে বিনামূল্যে শিক্ষা। ইহকালই শুধু নয়, তোমার পরকালও হবে আনন্দময়। তুমি হবে স্বর্গবাসী।’ সহজসরল আফ্রিকান নরনারী ফাঁদে পড়ে স্বধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টান হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে কেনিয়ার রাষ্ট্রপিতা জোমো কেনিয়াত্তা বলেন, ওরা যখন আমাদের দেশে এলো, ওদের হাতে ছিল বাইবেল আর আমাদের হাতে দেশ। দিনে দিনে অবস্থা খারাপ হয়। একদিন দেখা যায়, আমাদের হাতে ওদের বাইবেল আর ওদের হাতে আমাদের দেশ।
জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়ে মুসল্লিদের প্রচণ্ড ভিড় দেখতে পাই। ভিড় প্রতি শুক্রবারই বাড়ছে। যে মসজিদে নামাজ পড়ি সেখানে ঠাঁই না পেয়ে রাস্তায় জায়নামাজ পেতে বসতে হয়। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় ৮০০ ফুট দৈর্ঘ্যরে রাস্তায় নামাজিদের তিনটি সারি। পাঁচ সারি করা যায়; যান চলাচলের সুবিধার্থে দুই সারি সমান ফাঁকা রাখা হয়। মুসল্লির ভিড় দৃষ্টে ধরে নিই, বিশ্বাসী বাড়ছে। পড়শি সাজ্জাদ মতিন বললেন, ‘ঘুমিয়ে রয় অবিশ্বাস/বিশ্বাসীদের নরম অন্তরে।’ স্টাইলিশ সুরে উচ্চারণ, যেন বলছেন- ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুর অন্তরে।
পড়শি চোখ-কান খোলা রাখার পরামর্শ দিয়ে বলেন, আল্লাহর ওপর আমার যে রকম দৃঢ় বিশ্বাস, সেরকমই নিজের ওপর নিজের প্রচুর অবিশ্বাস। তিনি জানান, এই কেস শুধু তার মতো মধ্যবিত্তের একার না। যারা আমাদের ডানে-বাঁয়ে সামনে পেছনে, তাদের সবারই এ অবস্থা। ফর্মালি স্বীকার করে না তারা। কান সজাগ রেখে ওদের সংলাপ শুনুন, আপনার চোখ খুলে যাবে। নিজের ওপর যার বিশ্বাস নেই, তাকে কোন যুক্তিতে আস্তিক বলা যায়?
সাজ্জাদ মতিনের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করার মধ্যে ঝুঁকি (বক্তৃতা শুরু করে দিতে পারেন, তাতে কমপক্ষে ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট খরচ হওয়ার আশঙ্কা। ওদিকে শ্রোতার পেটে জুমা-উত্তর ক্ষুৎযন্ত্রণা) থাকায় দ্রুত মর্দন করতে হাত বাড়াই। আমার হাত মর্দন করে তিনি চলছেন তো চলছেনই, ছাড়বার আলামত নেই। বললেন, ‘রাবিশ মিড্ল ক্লাস! এরা সব সময় হতাশা ব্যক্ত করবেই। নামাজ শেষে মুনাজাতে বলবে, ‘দয়াময়। হারাম খাওয়া থেকে আমায় রক্ষা কর।’ তারপর? অফিসে দেরিতে হাজিরা দেবে আর ছুটির সময়ের ঘণ্টাখানেক আগে বেরিয়ে আসবে। অ্যারাবিয়ান হর্সের স্পিডে মেট্রো স্টেশনে ছুটবে। মেট্রোয় ঢুকেই লিপ্ত হবে পরনিন্দায়। বলবে কেউই নিয়ম মানে না। সবাই দুর্নীতিবাজ। সমাজটা পচে যাচ্ছে। এমন সমাজে আমার চাকরি! আমাকে দিয়ে এখানে কিসসু হবে না।
‘ঠিক আছে তোরে দিয়া কিসসু হবে না। ছেলেমেয়ের দ্বারাও হবে না, এটা বুঝলি ক্যামতে? তুই কী আলেমুল গায়েব?’ বলেন আমার পড়শি। তিনি হাত ছাড়তেই ‘তাড়া আছে, পরে আলাপ হবে’ বলে কেটে পড়লাম। রাতে টিভি পর্দায় আবির্ভূত এক চিন্তকও দেখি সাজ্জাদ মতিনের মতোই মধ্যবিত্তের ওপর কুপিত। চিন্তক বলছেন, তাঁর এক আত্মীয় নাম হিরন চৌধুরী, পেশায় কলেজশিক্ষক, বড়লোকদের সর্বনাশ আর নিজের পৌষমাস কামনা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে তাঁর বিশ্বাস জন্মায় যে কিছু না ছুঁয়ে দিনাতিপাতেই মুক্তি। তাই একদিন ঘোষণা করেন, ‘নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া ছাড়া আমার আর গতি নাই।’
সংসার হিরণকে দাগা দিয়েছে। তাই, তিনিও সংসারকে দাগা দেবেন। স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ের পরোয়া না করে নামবেন নিরুদ্দেশযাত্রায়। নামতেই হবে কেননা কলেজে পড়াচ্ছেন ২২ বছর। কবে যে ষড়যন্ত্রী সহকর্মীদের বাধা ডিঙিয়ে ভাইস প্রিন্সিপাল হবেন বলতে পারছেন না। নাহ্ তিনি বুঝে গেছেন, তাকে দিয়ে কিসসু হওয়ার নয়। হিরণের বাবার বড় ভাই মিরণ চৌধুরী বললেন, তোর পুত্র-কন্যা-স্ত্রীর কী হবে। ওদের খাওয়াবে কে? হিরণের উত্তর ওদের দেখবে আমার রাব্বুল আলামিন।
রাব্বুল আলামিনের ওপর তার অগাধ বিশ্বাস? না, তা নয়। চিন্তক জানান, মহল্লার অধিবাসীরা এককাট্টা হয়ে ‘পরিবারের খোরপোষের নিশ্চিত ব্যবস্থা করার পর যথা ইচ্ছা তথা যাও’ বলে চেপে ধরবে ভয়ে সিনিয়র প্রভাষক হিরণ চৌধুরী তার ব্যক্তিগত সংকট আল্লাহকে ফরোয়ার্ড করে দিয়েছিলেন। কায়দাটা কী তিনি ভারতীয় রাজনীতিক মোরারজিভাই দেশাইর কাছ থেকে শিখেছিলেন? ১৯৭৭ সালে অতি পাকা (৮১ বছর) বয়সে দেশাই তাঁর দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। শত কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও তাঁর ক্লান্তি নেই। নিরুদ্বিগ্ন চেহারা তাঁর। দারুণ ফিটনেস। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, আপনাকে সব সময় নিরুদ্বিগ্ন দেখায়। রাষ্ট্রীয় কোনো সংকট-সমস্যা কি কখনো আপনার ঘুম কেড়ে নেয় না?
দেশাইর উত্তর, ‘নিতে তো চায়। আমি নিতে দিই না।’ প্রশ্ন, সেটা কীভাবে? দেশাই বলেন, সংকট মোচনের উপায় বের করার চেষ্টা করি। এটা করতে চাই, সেটা করতে চাই, আবার ভাবি, থাক। আরেকটা করলে কী হয়। এ রকম উচিত-অনুচিত ভাবতে ভাবতে মধ্যরাত পেরিয়ে যায়। এবার ঘুমানো দরকার। তখন নিজেকে নিজে বলি, সংকট তৈরি করেছেন ঈশ্বর, সমাধানও করবেন ঈশ্বর। তুমি নাক গলাও কেন! বিষয়টি ঈশ্বরকে সঁপে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।
হিরণ উপরে আস্তিক আর ভিতরে নাস্তিক কি না, জানতে আগ্রহ হয়। টিভি পর্দার চিন্তকের কাছে প্রশ্ন করার উপায় ছিল না। আমাদের এলাকার মুদি দোকানি নজিবুর রহমান ছিলেন লোকদেখানো বিশ্বাসী। তার প্রিয় অভ্যাস ছিল ধারকর্জ করা। কর্জ করে কথামতো শোধ করলে আপত্তির কী! নজিবুর কথা দেন, টাকা দেন না। ক্লাস এইটের ছাত্র আমি। তার শ্যালক কানুর সঙ্গে এক স্কুলে পড়ি; এক মাঠে ফুটবল খেলি। কানু বলে, দেনা শোধ যেদিন করেন সেদিন দুলাভাইয়ের পেটে ভুডুর ভুডুর আওয়াজ হয়। দুই-তিন দিন ধইরা সেই আওয়াজ চলে। আপায় কয়, পাওনা টাকা দিছ। তাও তো জবানমতো দাও নাই। যেদিন দিবা কইলা তার সাত মাস পর দিছ। সেজন্য চেহারাখান এমন কইরছ যেন ঠাটা পইড়া তোমার বউ মরছে।
কানু জানায়, আপার মন্তব্য শুনে রুষ্ট নজিবুর স্ত্রীর চোয়ালে জোরে একটা ঘুষি মারেন। ঘুষি মারা বা ঘুষি খাওয়া তো কোনো হাসাহাসির ব্যাপার না। কিন্তু ‘আপারে ঘুষি মারল দুলাভাই’ বলেই কানুর হাসি শুরু। হাসি থামে না। মনে হচ্ছিল রোজ কেয়ামত তক হাসবে। বাধ্য হয়ে কানুর চোয়ালে ঘুষি মারতে চাইলাম। হাসি থামিয়ে কানু বলে, ‘দুলাভাই আপারে কয়, তুই মরলে আমি আরেক বিয়া কইত্তে পারুম? জিনিসপত্রের যে-ই দাম! আরেক বিয়ার বন্দোবস্ত করতে গেলে জান বারাইয়া যাইব না?’
এক বিকালে নজিবুরের বাড়িতে গিয়ে দেখি তিনি বাড়ির ঘরের সামনের কামরায় আসরের নামাজ পড়ছেন। পড়া শেষ করে আমাকে আপ্যায়নে ব্যস্ত হলেন। এমন সময় কানু জানায়, আপনার কাছে তিন হাজার টাকা পায়, সেই হাবু ভুঁইয়া এসেছেন। তাকে ঘরে আনতে বলেন নজিবুর। কানু ডাকতে গেল। আর অমনি জায়নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন নজিবুর। ঘরে ঢুকে হাবু দেখেন দেনাদার সেজদারত। চার রাকাত নামাজ পড়েও ফেললেন নজিবুর। মোনাজাত শেষে হাবুকে বললেন, আহ্হারে দেরি কইরা ফেললেন! তিন মিনিট আগে আইলেও দিতে পাইত্তাম। তিনি আমাকে দেখিয়ে বলেন য়্যাতার (মানে আমি) সামনেই তো একজনরে দেড় হাজার টাকা দিয়া ফালাইছি। তিনি আমার উদ্দেশে বলেন, ওই যে হাওয়াই শার্ট পরনে, পায়ে চপপল ভদ্রলোক, উনারে টাকা দিতে তো তুমি দেখছ। কী ভাই, দেখ নাই? আমি নিরুত্তর।
হাবু ভুঁইয়া দেনাদারের বয়ান বিশ্বাস করলেন। নামাজি মানুষ মিথ্যা বলে না। হাবু চলে গেলে আমি বলি, এরকম করলেন কেন? তিনি বলেন, পাবলিকরে খুশিকরণের জন্য যত ব্যবস্থা আছে তার মধ্যে সেরাটা হইল আল্লাহ ভরসা দেখানো। দেখলা না, বিশ্বাস কইরা চুপচাপ বিদায় হইছে। বললাম, আপনি আল্লায় বিশ্বাসী না? প্রশ্ন শুনে নজিবুর সশব্দে হেসে ওঠেন। এরপর বলেন, অবশ্যই বিশ্বাসী। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। তোমারে একটা বুদ্ধি দিই। কখনো কোনো নাস্তিকের লগে তর্কাতর্কিতে যাবা না। বেহুদা তোমার সময় বরবাদ হবে।
নাস্তিকদের কাজকারবার খুবই অপছন্দ করতেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪০তম প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান। তবু কখনো নাস্তিকদের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হননি। তিনি বলতেন, ঈশ্বর আমাদের জন্য কত সুন্দর করে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তবু কিছু লোক বলে বেড়ায়, কেউ সৃষ্টি করেনি। আপনা আপনিই পৃথিবী হয়ে গেছে। ‘স্রষ্টা’ আছেন এটা মগজে ঢোকানোর লক্ষ্যে রিগান একদিন ১২ জন নাস্তিককে নৈশভোজে ডাকলেন। ভরপেট সুস্বাদু খাবার খেয়ে তৃপ্ত নাস্তিকরা বলে, এমন মজাদার খাবার এর আগে আমরা কেউই খাইনি। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ মিস্টার রিগান। (ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর থাকাকালে রিগান এই ভোজ দিয়েছিলেন)। রিগান সহাস্যে বলেন, জেন্টেলমেন! এখন কি আপনাদের বিশ্বাস হয়, এই খাবারগুলো তৈরির পেছনে বাবুর্চি নামের এক স্রষ্টার হাত ছিল।
লেখক : সাংবাদিক