‘হা-মি-ম। ওয়াল কিতাবিল মুবিন। ইন্না আনজালনাহু ফি লাইলাতিম মুবারাকাতিন ইন্না কুন্না মুনজিরিন। ফিহা ইউফরাকু কুল্লু আমরিন হাকিম।’ সুরা দুখানের প্রথম চার আয়াত। হামিম হল হরফে মুকাত্তায়াত। এর অর্থ আল্লাহতায়ালা ভালো জানেন। তবে কোনো কোনো সূক্ষ্ম জ্ঞানী বলেছেন, হামিম অর্থ হেকমতপূর্ণ মহাপুরুষ মুহাম্মদ (সা.)। যাঁর ওপর হেকমতপূর্ণ গ্রন্থ আল কোরআন নাজিল হয়েছে। শপথ সে সুস্পষ্ট গ্রন্থের। নিশ্চয় এ গ্রন্থ আমরা নাজিল করেছি মুবারক রজনীতে। আর আমরা মানবজাতির জন্য সতর্ককারী। এ মুবরাক রজনীতে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।’ (সুরা হামিম, আয়াত ১-৪)। দুই নম্বর আয়াতে ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ শব্দ এসেছে। লাইলাতুন শব্দের সিফাত বা বিশেষ্য হলো মুবারাকাহ। বাবে মুফাআলাহ ওজনে ইসমে মাফউলের ওয়াহেদ মুজাক্কারের সিগাহ। মানে হলো, মুবারক রজনী। মুবারক আরবি শব্দ। আমরা অনেকেই দৈনন্দিন জীবনে শব্দটি ব্যবহার করি। মুসলমানদের মধ্যে মুবারক বা মোবারক নামের প্রচলন দেখা যায়। আবার ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময়ের সময়েও আমরা বলি ঈদ মোবারক। এ কারণে অভিধানে মুবারক শব্দের এক অর্থ লেখা হয়েছে- শুভেচ্ছাবিনিময়। তবে আয়াতে মুবারক শব্দটির ব্যবহার হয়েছে সৌভাগ্য, মহিমান্বিত, কল্যাণ, মঙ্গল, বরকতময় বোঝাতে। তাহলে লাইলাতুম মুবারাকাহ অর্থ দাঁড়ায়- সৌভাগ্যরজনী, বরকতময় রজনী, মহিমান্বিত রজনী, কল্যাণ ও মঙ্গলময় রজনী। কোরআন নাজিলের রাতটি কেবল সৌভাগ্য ও বরকতময়ই নয় বরং এটি প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাতও। কেননা আল্লাহ যত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সবচেয়ে সেরা সিদ্ধান্ত হলো পৃথিবীবাসীর জন্য কোরআন নাজিল করা। তাহলে যে রাতে কোরআন নাজিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে রাত অবশ্যই বরকতময় ও প্রজ্ঞাপূর্ণ। চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘ফিহা ইউফরাকু কুল্লু আমরিন হাকিম।’ ফারাক শব্দ থেকে এসেছে ইউফরাকু। ফারাক মানে হলো আলাদা করে দেওয়া। তাহলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এ রাতে আলাদা করা হয় বা স্থির করা হয়। কেন আলাদা করা হয়? বাস্তবায়নের সুবিধার জন্য। আজকের আধুনিক পরিকল্পনা বিজ্ঞানেও দেখা যায়, কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি টার্গেট নির্ধারণ করা হয়। বিশাল টার্গেট যখন বছর-মাস-দিনে ভাগ করা হয় তখন কাজটি বাস্তবায়ন সহজ হয়। মানুষ এ সিস্টেম নিজে শেখেনি। আল্লাহ শিখিয়েছেন। আল্লাহতায়ালাও বিশ্ব পরিচালনার জন্য বছরভিত্তিক পরিকল্পনা করেন। এটাকে বার্ষিক বাজেটও বলে থাকেন কোনো কোনো জ্ঞানী। এ জন্য আগামী বছর বিশ্ব পরিচালনায় যে বিষয়গুলো ঘটবে সেগুলো আল্লাহতায়ালা ইউফরাকু মানে আলাদা করেন এবং স্থির করেন যে এগুলো এ বছর বাস্তবায়ন করা হবে। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, সে বরকতময় সৌভাগ্যরজনী কোনটি? জগদ্বিখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস এবং তাঁর প্রিয়তম ছাত্র ইকরিমা (রা.) বলেছেন, সে রাতটি হলো শাবান মাসের ১৫ তারিখের রজনী। এ রাতে আগামী এক বছর বিশ্বে কী ঘটবে, কে জন্ম নেবে, কে মৃত্যুবরণ করবে, কে হজে যাবে, কে বিদেশ যাবে, কে দেশে ফিরবে, কার জেল হবে, কে মুক্তি পাবে, কে পালিয়ে যাবে, কে ক্ষমতা পাবে- এমন সব বিষয় সিদ্ধান্ত হয়। যেহেতু এ রাতে ভাগ্য নির্ধারিত হয় তাই উপমহাদেশে শবেবরাত বা ভাগ্যরজনী হিসেবেও রাতটি পরিচিত। (তাফসিরে মাজহারি, ১০ম খণ্ড, ৫২০ পৃষ্ঠা)।
‘ইন্না আনজালনাহু ফি লাইলাতিম মুবারাকাতিন ইন্না কুন্না মুনজিরিন। নিশ্চয় এ গ্রন্থ আমরা নাজিল করেছি মুবারক রজনীতে।’ এখানে একটি বিষয় খোলাসা করা দরকার। সুরা দুখানের মুবারক রজনী যে শবেবরাত এটা অনেক মুফাসসিরই মানতে চান না। তাদের যুক্তি হলো, মুবারক রজনী বলতে লাইলাতুল কদর বোঝানো হয়েছে। যেহেতু সুরা কদরে বলা হয়েছে, রমজান মাসে কোরআন নাজিল হয়েছে, তাই লাইলাতুম মুবারাকাহ শবেবরাত নয় শবেকদর। এর জবাব রয়েছে আবু জোহরা থেকে বর্ণিত ইবনে আব্বাসের (রা.) বর্ণনায়। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘শবেবরাতের রাতে আল্লাহ সবকিছু সিদ্ধান্ত নেন। আর শবেকদরের রাতে সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন।’ (তাফসিরে মাজহারি, ১০ম খণ্ড, ৫২০ পৃষ্ঠা)। যারা লাইলাতুম মুবারাকাহ বলতে শবেবরাত উদ্দেশ্য করেছেন তাদের মতে, ১৫ শাবানের রাতে আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে কোরআন নাজিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর এক মাস পরেই রমজান মাসে কোরআন নাজিল হয়েছে। যেহেতু সিদ্ধান্ত নেওয়া কাজের প্রথম ধাপ তাই আল্লাহতায়ালা ‘ইন্না আনজালনাহু ফি লাইলাতিম মুবারাকাতিন’ বলেছেন। রমজানের কোরআন নাজিলের সঙ্গে শাবানের ১৫ তারিখের কোরআন নাজিলের সিদ্ধান্ত যেন মিলিয়ে না ফেলা হয়, এ কারণেই পরের আয়াতে স্পষ্ট করে আল্লাহ বলেছেন, ‘ফিহা ইউফরাকু কুল্লু আমরিন হাকিম। এ বরকতময় রাতে প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজের সিদ্ধান্ত হয়।’ আর কোরআন নাজিল যে প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত, এ বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই। ১৫ শাবানের রাতে কোরআন নাজিল হয়েছে, এ কথার সঙ্গে রমজান মাসে কোরআন নাজিল হওয়ার কোনো বিরোধ নেই। বিষয়টি আরও খোলাসা কানজুল ইমান ওয়া খাজাইনুল ইরফানের লেখক বলেছেন, ‘শাবান মাসে লাওহে মাহফুজ থেকে পৃথিবীর নিকটতম আকাশে পুরো কোরআন একত্রে নাজিল হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে দীর্ঘ ২৩ বছরে পৃথিবীর বুকে কোরআনের ঝরনাধারা পূর্ণ হতে থাকে। আর এর শুভসূচনা হয় রমজান মাসের কদরের রাতে।’ (কানজুল ইমান ওয়া খাজাইনুল ইরফান, ৯০৩ পৃষ্ঠা)।
লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট, পীর সাহেব, আউলিয়ানগর