উইলিয়াম জেমস ডুরান্ট ছিলেন ১৮৮৫ সালে জন্ম নেওয়া একজন মার্কিন ইতিহাসবিদ, দার্শনিক, লেখক ও শিক্ষাবিদ। মানব সভ্যতার আদ্যোপান্ত নিয়ে দীর্ঘ ১০ বছর গবেষণার পর ১১ খণ্ডে লেখা মহাগ্রন্থ ‘দি স্টোরি অব সিভিলাইজেশন’ তাঁকে অমরত্ব দান করেছে। মানুষের জীবনে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কিংবা শিক্ষকতা করার উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁর বেশ কিছু চমকপ্রদ উক্তি রয়েছে। তবে কোন ধরনের শিক্ষা আমাদের অজ্ঞতা দূর করবে এবং পৃথিবীকে বদলে দেবে এ নিয়ে তর্ক আছে। কারণ আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই অজ্ঞতা দূর ও পৃথিবীকে পাল্টে দিয়েছেন বহু গুণীজন। বর্তমান বিশ্বে সফল মানুষের তালিকায় অবধারিতভাবে উঠে আসে মাইক্রোসফটের বিল গেটস, ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ, অ্যাপলের স্টিভ জবস প্রমুখের নাম। তাঁদের কেউ কলেজ পর্যায়ে লেখাপড়া শেষ করতে পারেননি। জগৎসেরা লেখক চার্লস ডিকেন্স, মার্ক টোয়েন কিংবা আমাদের নজরুলও ছিলেন স্কুলজীবনে ঝরে পড়া ছাত্রের তালিকায়। শিল্প, সাহিত্য, ক্রীড়া, কলা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতেও এগিয়ে গেছেন শিক্ষার সার্টিফিকেট লাভে ব্যর্থ অনেকেই। পৃথিবীর সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের প্রথাগত বিদ্যা বিঘ্নিত হয়েছিল নানা কারণে। তিনি কোনোরকমে একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হতে পেরেছিলেন। কারণ অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যায় অসাধারণ হলেও ভাষা শিক্ষা, রসায়ন কিংবা জীববিজ্ঞানে তিনি ভালো ফলাফল করতে পারতেন না। ফলে প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি অনুসারে তাঁর পক্ষে উচ্চশিক্ষা লাভ করা ছিল একটি কঠিন বিষয়। তবে তাঁর সৌভাগ্য যে, অঙ্ক ও পদার্থবিজ্ঞানে অস্বাভাবিক প্রতিভা দেখে তাঁর সামনে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে দিয়েছিলেন তৎকালীন কয়েকজন শিক্ষক। পরবর্তী প্রায় ১০০ বছরে হাজারো শিক্ষক ও বিজ্ঞ ব্যক্তিরা গবেষণা করে চলেছেন আইনস্টাইনের আবিষ্কার ও তাঁর দেওয়া বিজ্ঞানের সূত্র নিয়ে।
এমন সব কথা ঘুরেফিরে বারবার মনে উঁকি দেয় সপ্তাহজুড়ে শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নানা জটিলতাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকায় চলমান সংঘাত, ধাওয়া কিংবা বক্তব্যের ঝড় দেখে, যা সাধারণ মানুষ বিশেষত পথচারীদের জীবনে যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠেছে। একসময় এ দেশে বেসরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। পুরনো আমলে প্রতিষ্ঠিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল আশপাশের এলাকার সব সরকারি ও বেসরকারি কলেজগুলো।
১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পূর্বে অধিভুক্ত সব কলেজকে এই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়। এতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অন্যান্য কলেজের বাড়তি চাপ থেকে মুক্ত হয়ে নিজস্ব শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পায়। তবে এমন চাপমুক্ত হওয়ার পরও শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে কতটা ইতিবাচক ভূমিকার রাখতে পেরেছে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, তা ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থান ও বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয়েছে। এ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার দায় নিয়ে প্রায় সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও অন্যান্য বিভাগীয় প্রধানদের মাথা নিচু করে চলা কিংবা পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। এতে প্রমাণিত হয়েছে যে, তারা শিক্ষার মান উন্নয়ন বা ছাত্রদের কল্যাণের চেয়ে নিজের সুযোগ সুবিধা ও দুর্নীতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিলেন এবং ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন দলীয় পরিচয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রে নোংরা রাজনীতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ ঢাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিদ্যাপীঠ সাতটি কলেজ। এ কলেজগুলো ২০১৭ সাল পর্যন্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই ছিল। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপাচার্য ২০১৭ সালে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। তাঁরা দুজনই তৎকালীন সরকারের চরম আজ্ঞাবহ ছিলেন বলে সবার জানা। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পূর্বে তাঁদের অধীনে থাকা সাতটি কলেজকে আবারও তাঁদের অভিভুক্ত করার মিশনে সফল হয়।
প্রথমদিকে এ নিয়ে সাত কলেজে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস ছিল। কারণ একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে বিখ্যাত ছিল। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদের বাড়তি কদর ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন বা অ্যালামনাই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের জন্য একটি নির্ভরতার নাম ছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় যে, সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হলেও তাদের শিক্ষকরা আসছেন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার থেকে। এদিকে বিসিএস পর্যায়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার বদলে কোটা ও দলীয় পরিচিতি ছিল মূল বিবেচ্য বিষয়। ফলে সাত কলেজেই শিক্ষার মান নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের গবেষণাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি ছিল। প্রশাসনিক বিভিন্ন কারণে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হতো। কিন্তু সেখানে তারা যেন ছিল দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, ২০১৭ থেকে ২০২৪- এ সাত বছরে ৭টি কলেজের শিক্ষার্থীদের সেবা দেওয়ার জন্য পৃথকভাবে তেমন কোনো অবকাঠামো বা জনবলের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পর ছাত্রাবাস বা অনুষদ নিয়ে প্রশ্ন করলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের কলেজের নাম চলে আসত। আর কলেজের নাম শুনলে ভ্রু কুঁচকাতো অনেক মানুষ। সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল ভর্তির কার্যক্রম, পরীক্ষার ফরম ফিলাপ এবং মূল্যায়নপত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে ভোগান্তি ও অবৈধভাবে টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে।
সাতটি কলেজকে ফিরিয়ে আনার এমন সিদ্ধান্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও খুশি হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে একই সংখ্যক জনবল বা একই অবকাঠামো নিয়ে অতিরিক্ত সাত কলেজকে সেবা প্রদানের চেষ্টার ফলে সার্বিকভাবে সেবার মান কমে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপরও সাত কলেজের কিছু অতিরিক্ত কাজ করার দায়িত্ব অর্পিত হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শিক্ষার্থীরাও বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতেন।
এমন পরিস্থিতিতেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফেরত যাওয়াটাই হয়তো একটি ভালো সমাধান হতে পারত। কিন্তু নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়েও। তাই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা কিছুতেই আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পক্ষে ছিল না। এখন তাদের দাবি সাত কলেজ নিয়ে একটি নতুন স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। এর আগে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরাও রাজধানীর রাস্তা ও রেলপথ অবরোধ করে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সরকার অচিরেই হয়তো এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেবে।
একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে অনেকেরই অনেক ধরনের স্বার্থ রক্ষা হয়। কিন্তু শিক্ষা বা শিক্ষার্থীরা এ ক্ষেত্রে কীভাবে উপকৃত হবেন, তার উত্তর অনেক যদি কিংবা কিন্তুর ওপর নির্ভরশীল। আবার সাত কলেজে বর্তমানে যে শিক্ষক এবং এইচএসসি পর্যায়ে যে শিক্ষার্থীরা আছে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হবে। অনেক আগ থেকেই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তাদের সন্তুষ্ট করার মতো দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয় সংশ্লিষ্ট মহল। ফলে আবারও ঢাকাকে অচল করে দাবি আদায়ের সংগ্রামে নামতে হয় তাদের।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জাতিসংঘ, মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশ ও বাংলাদেশের করপোরেট জগতে দীর্ঘদিন চাকরি ও বহু দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে বিনীত নিবেদন করে বলতে চাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার গৌরব ফিরে পাক। অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় থাকুক, যা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই আমাদের সন্তানরা শিক্ষকতা করছে। আমরা নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে বিচক্ষণ হলে অবশ্যই তাদের ফিরিয়ে আনতে পারি অথবা তাদের সেবা গ্রহণ করতে পারি এবং তাদের দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারি।
কায়মনো বাক্যে প্রার্থনা করি, শিক্ষা হোক সৎ মানুষ, উদ্যোক্তা ও দক্ষ কর্মী গড়ার হাতিয়ার।
সনদসর্বস্ব বেকারে দেশ সয়লাব হয়ে গেছে। আরও বেকার এক ভয়ংকর পরিস্থিতিতে ফেলবে এ দেশকে। প্রযুক্তির কল্যাণে কৃষি, কুটিরশিল্প, রন্ধনশিল্প, সূচি বা বুটিকশিল্প, প্রকাশনা শিল্প, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমনকি কনটেন্ট তৈরি করেও বেকারত্ব দূর করেছে লাখো মানুষ। আর আমাদের শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করছে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে, যা তাদের একটি সনদ প্রদান করবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই কি সব সমস্যার সমাধান? একটু উদাহরণ দিই।
২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ১৪৯০ জন সৃজিত শিক্ষক পদের বিপরীতে শূন্য ৪৩৫টি, ৭৯২ কর্মকর্তার পদের বিপরীতে ২০০টি, ১০৪২ সহায়ক কর্মচারী পদের বিপরীতে শূন্য ২৫১টি এবং ১৯০৯ সাধারণ কর্মচারীর বিপরীতে শূন্য ৯০৯টি। এখানে পাঁচটি বিভাগে প্রায় ১ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২৪ জন। ফলে একজন শিক্ষককে সাতটি কোর্সে পড়াতে হয়।
ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ আছে, শিক্ষক আছে কিন্তু শ্রেণিকক্ষ নেই। তাই দুটি ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা। (সূত্র : প্রথম আলো ২৯ জানুয়ারি ২০২৫)। এভাবে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় পাঠদানসংক্রান্ত নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর বাইরে আবাসিক সংকট, মাদক ও সন্ত্রাসের থাবা, খাবারের নিম্নমান ইত্যাদি প্রশাসনিক সমস্যার তালিকাও বেশ দীর্ঘ। তাই বলে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই কিন্তু পরীক্ষা গ্রহণ বা সনদ প্রদান বন্ধ করেনি। ফলে দেশে সনদধারী বেকারের সংখ্যা কেবলই বাড়ছে। অচিরেই হয়তো অচল ঢাকাকে আরও অচল করে দুটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আদায় করে নেবে শিক্ষার্থীরা। মহানন্দে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদও হাতে পাবে। কিন্তু তারপর?
লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল : [email protected]