মানবজাতিকে আল্লাহর পথে আহ্বান করাই ছিল নবী-রসুলগণের প্রধানতম দায়িত্ব। শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পবিত্র কোরআনে দাঈ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহ্বানকারীরূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি (সুরা আহজাব-৩৩:৪৬)।’
মানুষকে আল্লাহর পথে আসার দাওয়াত জানায় তাবলিগ জামাত। দাওয়াত শব্দটির আভিধানিক অর্থ আহ্বান করা। ইসলামে বিপথগামী মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানানোকে দাওয়াত বলা হয়।
মানুষকে আল্লাহর পথে আসার আহ্বান জানানোর মাধ্যমে তাবলিগ জামাত শুদ্ধ মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়। তাবলিগের দাওয়াত নিয়ে যারা মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘোরেন, তারা হলেন মহান স্রষ্টা কর্তৃক উল্লিখিত সেসব বান্দা, যাদের কথা সুরা আলে ইমরানের ১০৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ করা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে এমন এক দল হোক যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে, এরাই সফলকাম।’ তাবলিগ জামাত তাদের দীনি দায়িত্ব পালনে সত্যিকার অর্থেই অতুলনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দুনিয়াদারি লাভ-লোকসান ও আত্মপ্রচার উপেক্ষা করে তারা মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরছে মানুষের সামনে। বিপথগামী মানুষকে সুপথে আনার জন্য তারা নিবেদিতপ্রাণ মনোভাব নিয়ে দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সুরা হা-মিম-আস সাজদার ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘কথায় কে উত্তম ওই ব্যক্তি অপেক্ষা যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহ্বান করে এবং বলে আমি তো অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত।’ এ আয়াতে যারা আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। তাদের প্রশংসা করা হয়েছে এ জন্য, তারা শুধু আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বানই করে না নিজেরাও নেক আমল করে এবং নিজেদের মুসলমানের মধ্যে একজন ভাবে। বিশ্ব ইজতেমা হলো ওই দাওয়াতদাতাদের ইজতেমা। দাওয়াত ও তাবলিগের মূলনীতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, আপনি পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়। নিশ্চয় আপনার পালনকর্তাই ওই ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষভাবে জ্ঞাত রয়েছেন, যে তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং তিনিই ভালো জানেন তাদের, যারা সঠিক পথে আছে (সুরা নাহল : ১২৫)।
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অনুসারীদের দাওয়াতি মেহনতে নিয়োজিত হওয়ার দিকনির্দেশনা দান করেছেন। বুখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে নম্র ব্যবহার কর, রূঢ় আচরণ কর না, সুসংবাদ দাও, ভীতসন্ত্রস্ত কর না।’ মূলত কীভাবে দীনের দাওয়াত হবে তার গাইডলাইন বর্ণিত হয়েছে ওই হাদিসে। আল্লাহর প্রকৃত প্রেমিকরা জান ও মাল উৎসর্গ করে তাবলিগের মেহনতে নিজেদের নিয়োগ করেন। আল্লাহ ও রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশিত পথে সবাইকে আসার জন্য আহ্বান করেন তারা। তারা ফরজ হুকুমগুলো যথাযথভাবে পালনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন, রসুলের সুন্নত ভুলে গিয়ে যারা বিপথে চলছে, কিংবা সিদ্ধান্তহীনতায় হাবুডুবু খাচ্ছে, তাদের সঠিক পথের দিশা দেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। জগদ্বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দের বুুজুর্গ হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) মানুষকে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পথে আনার জন্য যে মেহনত শুরু করেন, তা আজ দীন প্রতিষ্ঠার মহা আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। তাবলিগ জামাত পথভোলা মানুষকে আল্লাহ ও রসুলের পথের সন্ধান দেওয়া ও বিপথগামীদের সঠিক পথ দেখিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে। মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করছে তাবলিগ জামাত। সৎ কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেও তারা মুমিনদের উদ্বুদ্ধ করছেন। বিশ্বে শান্তি ও সহমর্মিতার পরিবেশ সৃষ্টিতেও অবদান রাখছে হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত এই জামাত। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি গর্হিত কাজ হতে দেখে তবে তা হাত তথা শক্তি দিয়ে পরিবর্তন করবে। যদি না পারে তবে মুখ দিয়ে বলে তা পরিবর্তন করবে। যদি তা-ও না পারে তবে অন্তর দিয়ে অপছন্দ করবে। আর এটা হলো দুর্বল ইমানের পরিচায়ক।’ মুসলিম, মিশকাত। আল কোরআনের আরও কিছু আয়াতে মুমিনদের দাওয়াতি কার্যক্রমে জড়িত হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজেও উপস্থিত মুসল্লিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন তারা যেন যারা উপস্থিত নেই তাদের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দেয়। বস্তুত এ আহ্বানের মাধ্যমে দাওয়াতি কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক