জন্ম ও বেড়ে ওঠা আমার যে শহরে, সেখানে রাস্তার পাশে উত্তর-দক্ষিণে প্রায় আট শ ফুট দৈর্ঘ্য ও দেড় শ ফুট প্রস্থ এক জলাশয়ে ‘মিয়া মৎস্য খামার’। গণপূর্ত বিভাগের মালিকানাধীন জলাশয়। ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে মনে করেছিলাম। ভুল। সবই ভুল। রাজনীতিক মনশাদ উল্লাহ মিয়ার নেতৃত্বে এই খামারে মাছের চাষ চলছে। ইজারা নিতে হবে কেন? প্রাদেশিক গভর্নর আবদুল মোনায়েম খান, যাকে সম্বোধন করেন ‘ছোটভাই’ তার অভিধানে ইজারা নামে কোনো শব্দ নাই।
প্রচারবিদরা বলেছেন, চার মাস অন্তর খামারের মাছ বিক্রি করা হবে। খামারে বিনিয়োগকারীরা বছরে তিনবার লভ্যাংশ পাবেন। বিশেষজ্ঞদের দিয়ে হিসাব কষা হয়েছে; ‘পাঁচ শ টাকা বিনিয়োগ করলে প্রতি চার মাসে মাছ বিক্রি থেকে আসবে তিন শ টাকা অর্থাৎ বছরে বারো শ টাকা।’ প্রচারেই প্রসার। দেড় হাজার মানুষ পাঁচ শ টাকা করে জমা দিয়ে মনশাদ উল্লাহ মিয়ার ভাষায় ‘খামারের মালিক’ হয়ে গেলেন। বিনিয়োগ করা টাকার পরিমাণ সাড়ে সাত লাখ।
ইতোমধ্যে একটা কাণ্ড ঘটে যায়। কড়া মেজাজের এক ব্যক্তি গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে বদলি হয়ে এলেন। অনুমতি না নিয়ে সরকারি পুকুরে মাছ চাষ করছে এমন হিম্মত কী করে হলো? গর্জে ওঠেন তিনি। হুকুম দিলেন, ‘অনধিকার চর্চার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নাও। ডাকো পুলিশ, ধরিয়ে দাও হার্মাদগুলোকে।’ হুকুম বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সেই ফলকটি চুরমার করে দেওয়া হলো, যেই ফলকে লেখা ‘মিয়া মৎস্য খামার’।
শাসকদলীয় রাজনীতিক মনশাদের অনুরাগীদের অন্যতম হেনজু মিয়া ছুটে গিয়েছিলেন খামারে। ফলক বিচূর্ণকরণে লিপ্ত গণপূর্ত কর্মীদের সঙ্গে হেনজু মিয়ার সংলাপ বিনিময়ভিত্তিক কেচ্ছাগুলোর মধ্যে কোনটা সহি আর কোনটা কল্পনাপ্রসূত তা নির্ণয়ের উপায় ছিল না। আমাদের মহল্লার সমাজসেবক রেজাউল করিমের মুখে ঘটনাটির একটি ভাষ্য পেয়েছি। হেনজুর বৈশিষ্ট্য বিষয়ে তিনি যেসব রসালো কথ বলেছিলেন তার সারসংক্ষেপ হচ্ছে ‘হাস্যমুখে দাস্যসুখে বিনিত জোড় কর/প্রভূপদে সোহাগ মদে দোদুল কলেবর।’
‘আস্পর্ধার একটা লিমিট থাকন দরকার।’ বলেন, হেনজু মিয়া, আমনে গো নতুন সাবরে ভূতে কামড়াইছে মনে অয়। মনশাদ মিয়া সাবের হাত কত লম্বা উনি যদি জানতেন তাইলে সাইনবোর্ড ভাঙন দূর কথা। সাইনবোর্ডের ছায়ার কাছেও আমনেগোরে আসতে কইতেন না। এখন যান, ফিররা যান। খামারের অফিসঘরে শাবল চালাইয়া নিজেগো জিন্দেগি বরবাদ কইরেন না।’ গণপূর্ত কর্মীরা বলে, ‘একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার সাব পাঁচ মিনিটের মধ্যে আইসা পড়তেছেন। উনার সামনে পড়লে আমনের জিন্দেগি ফর্দাফাই হয়ে যাবে।’ হেনজু রুষ্টকণ্ঠে বলেন, ‘মনশাদ মিয়ার হাত কত লম্বা ...।’ গণপূর্ত কর্মীদের সর্দার বলেন : এইটা তো দেখি পাগলের ওস্তাদ পাটনাই ছাগল! নিজেদের গর্দান যাওয়ার জোগাড়, তারপরও মিয়ার হাত মিয়ার হাত করতাছে।
মিয়াদের হাত লম্বা হওয়াই নিয়ম। সাহেবদের হাতও লম্বা। অনেক লম্বা সেই হাত লগির উচ্চতা ধারণ করে। ডগায় থাকে আঁকশি, যা দিয়ে টান মেরে বশীভূত করতে হয়। সেই আঁকশিতে নিজেকে সমর্পিত করেছিলেন সদ্য-প্রাক্তন নির্বাহী প্রকৌশলী (একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার)। গভর্নরের ছোট ভাইতুল্য রাজনীতিকের আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন তিনি। তাই বলতেন, মানুষের উপকারের জন্য মাছ খামার গড়েছেন মনশাদ। সবার উচিত এই লিডারের সঙ্গে সহযোগিতা করা। রেজাউল করিমের মতো দুষ্টজনরা এই প্রস্তাবের জবাবে বলেছে, এই উপকারের ভিতরে ঘাপটি মেরে আছে অন্ধকার।
সাড়ে সাত লাখ টাকা যারা বিনিয়োগ করেছে, তারা কতটুকু উপকার পেয়েছে, তা কয়েক দিনের মধ্যে সবাই জেনে গেল। কবি নির্মলেন্দু গুণের লেখা এক গল্পে আছে- অনটনগ্রস্ত পরিবারের কর্তা সারা দিন বাইরে কাটিয়ে ঘরে ফিরলে রোগে কাতর শয্যাশায়ী উদ্বিগ্ন স্ত্রী বলে, টাকা এনেছ টাকা? কর্তা বলল, না। আমি তোমার জন্য একবুক হতাশা এনেছি। মিয়া মৎস্য খামারের বিনিয়োগকারীরা পেয়েছে একবুক হতাশা।
বিনিয়োগকারীদের কয়েকজন প্রতারণার মামলা ঠুকেছিলেন মনশাদ উল্লাহ মিয়ার বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তারও হয়েছেন। হাত লম্বা হওয়ায় জামিনে মুক্তি পেয়ে যান তিনি। সরকারি সম্পত্তি জবরদখল করে মাছের খামার করার অভিযোগে মামলার আসামি হওয়ার পর তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী বাসেতকে কত ধানে কত চাল তা বুঝিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। হুমকিটা যে কথার কথা না, তা প্রমাণের জন্য রাজধানীতে গিয়ে অনেক খরচও করেন। ফলোদয় হলো না। কিন্তু কেন?
প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে অনেক মেহনত করেন হেনজু মিয়া। সমাজসেবক রেজাউল জানান, লম্বা হাতবিশিষ্ট মনিবের সামনে মৌখিক প্রতিবেদন পেশকালে ইঞ্জিনিয়ার সাবেতকে স্ত্রীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার পুত্র জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা (সুমুন্দির পুত সুমুন্দি) বলে উল্লেখ করেন হেনজু। বলেন, এই জাউরার হাত আমনের হাতের তুনো লম্বা। হ্যাতার খালতো বইনের জামাই মিনিস্টার। যে সেই মিনিস্টার না। ইম্পটেন মিনিস্টার। গভর্নর পেসিডেনরেও নাকি পাত্তা দেয় না।
‘কাজেই নিরাপত্তার স্বার্থে কত ধানে কত চাল বুঝিয়ে দেওয়ার প্রোগ্রাম বাতিল করা উত্তম’ বুদ্ধি দেন হেনজু, ‘নইলে ওরকম প্রোগ্রাম আঙ্গো বিরুদ্ধে শুরু কইরা দিতে পারে।’ খাঁটি কথা বলেছেন হেনজু। শক্তের ভক্ত নরমের যম- এই প্রবচন শুধু হেনজু মিয়া নন, আমরা যারা নিজেদের মধ্যবিত্ত পংক্তির ভদ্র সন্তান বলে জাহির করি, তাদেরও মান্য নীতি। দুর্বলের বিরুদ্ধে সিংহের মতো গর্জে ওঠা আর শক্তিমানের সমর্থনে নতজানু হওয়ার ঐতিহ্য বহন করছে আমাদের সমাজ। চণ্ডশক্তির অবর্তমানে তাকে শূলে চড়ানোর অঙ্গীকার করি আমরা। আবার চণ্ডশক্তির মুখোমুখি হলে তাকে করি কুর্নিশ।
উনিশ শ একাত্তরে গণবিরোধী ভূমিকা নিয়েছিলেন মনশাদ। মুক্তিবাহিনীকে ‘মুরগি বাহিনী’ বলে গালি দিতেন। বলতেন, পাকিস্তানের সোলজার হইল গিয়া ওয়ার্ল্ডের বেস্ট সোলজার। এই সোলজারের সঙ্গে ফাইট দেওয়া মুরগি বাহিনীর কাম না। ফাইট দিতে আইলে মুরগি মুসাল্লাম হইয়া যাবে য়্যা! নভেম্বরের শুরুতে মুক্তিবাহিনী শহরের পূর্ব প্রান্তের কাছাকাছি এসে অবস্থান নেয়। প্রতিটি রাতে ওরা ফাঁকা গুলির আওয়াজ করে। ভয়ে ক্যাম্প ফেলে চম্পট দেয় রাজাকাররা। রটনা আছে, তখন পাড়াতুতো ভাতিজা মবজলের পরামর্শে গা-ঢাকা দেন মনশাদ ও তার পারিষদরা।
জানা গেছে, মবজল যার প্রকৃত নাম মোফাজ্জল হোসেন ‘পরামর্শ’ দেয়নি, ভয় দেখিয়েছে। বলেছে, চাচা এলাহি কারবার দেখলাম। রেললাইনের পূর্ব দিকে হাই স্কুল দখল কইরা ক্যাম্প বানাইছে মুক্তিবাহিনী। কয়েক হাজার মুক্তি কিলবিল করতেছিল। আমারে দেইখা পাকিস্তানি স্পাই সন্দেহ করল। কাছে ডাইকা নিয়া জিগায়, বাড়ি কই? এলাকার নাম কইলে কয়, শুয়োরের বাচ্চা মনশাইদ্দারে চিন? কইলাম, চিনুম না কেন! আমগো বাড়ির তিন বাড়ি পরই হ্যাগো বাড়ি। মনশাদ বলেন, ‘খাইছস আমারে!’
মনশাদ দ্রুত এলাকা ছাড়েন। আমরা মবজলের কাছে জানতে চেয়েছি, উনি কোথায় গেলেন? সে বলে, শুনছি ওয়ার্ল্ডের বেস্ট সোলজাররা কুমিল্লায় পলানোর সময় হ্যাগো জিপে উঠবার চেষ্টা করতেছিলেন। একটা সোলজার লাত্থি মাইরা ফালাই দিছে। পাকা রাস্তায় চিৎ হইয়া পড়ছে। মাথায় চোট খাইছে। ব্যস্ ওফাত হইয়া গেল। ভালোই হইছে। মুক্তিরা পাইলে তো গুলিতে উনারে ফালাফালা কইরা দিত। কী কন্ দিত না?
পরের ধন আপন করে নেওয়ার সফল সাধক তো শুধু মনশাদ একা নন। তস্করবৃত্তির এই লোকরা নিপুণ হাতে ফাঁদ পাতে আর শিকার করে। তারা আলো দেখায়। আশার আলো। দ্রুত লাভবান হওয়ার জন্য উতলা মানুষ ভাবে, উপকৃত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করব কেন? কিন্তু অচিরেই তারা উপলব্ধি করে, উপকারের ছদ্মবেশে জীবনটাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করার আয়োজন ছিল ওটা।
এ বিষয়ে সুফি সাধক ইমাম গাজ্জালি বর্ণিত গল্পটি স্মরণীয়। ফজরের আজান শোনার পর নামাজ পড়তে মসজিদে রওনা দেন ধর্মভীরু এক ব্যক্তি। অন্ধকার থাকায় তিনি দেখতে পাননি যে বৃষ্টিতে ভিজে গেছে পথ। পিছলিয়ে কাদায় পড়ে যান তিনি। পরনের কাপড় ময়লা হয়ে গেল। নতুন পোশাক পরতে বাড়ি ফিরে গেলেন। পরিষ্কার জামাকাপড় পরে ফের তিনি রওনা দেন মসজিদে। পথিমধ্যে আবার আছাড় খেয়ে পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। নতুন কাপড় পরে আবার মসজিদমুখো হলেন সেই মুসল্লি। মসজিদের অদূরে পৌঁছতেই আছাড় খাওয়ার উপক্রম। তিনি চিৎপাত হওয়ার আগেই একটা লোক তাকে ধরে ফেলে। সেই লোকের হাতে লন্ঠন। লোকটা বলে, চলুন। আলোর পথ দেখে দেখে হাঁটুন।
‘উপকার করলে বাবা। তোমায় ধন্যবাদ।’ বলেন মুসল্লি। লোকটি বলে, ‘আমি আপনার কোনো উপকার করিনি। করেছি নিজের উপকার।’ মুসল্লি বলেন, ‘তুমি কে গো বাবা।’ লোকটা বলে, আমি ইবলিস। আপনি প্রথমবার পড়ে যেতেই আল্লাহ আপনার জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দেন। দ্বিতীয়বার পড়ে গেলে আপনার পড়শিদের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তৃতীয়বার যদি পড়ে যেতেন তাহলে আল্লাহ আপনার মহল্লার সবার গুনাহ মাফ করে দিতেন। আমার চোখের সামনে এত লোকের উপকার! তা কি আমি হতে দিতে পারি?
লেখক : সাংবাদিক