যদি জানতে চাওয়া হয়, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও দ্রুতগতির সুপার কম্পিউটার কোনটি- তাহলে এর উত্তরে বলতে হবে, আমেরিকার হিউলেট প্যাকার্ড বা এইচপির তৈরি এইচপি ফ্রন্টিয়ার কম্পিউটার। এটি সুপার কম্পিউটার ঘরানার, এখন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে। ফ্রন্টিয়ার প্রতি সেকেন্ডে ১.১০২ এক্সা-ফ্লপস কাজ করতে পারে। তবে বিশ্বে এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটার যুক্তরাষ্ট্রেরই তৈরি এইচপির ইআই ক্যাপ্টেন। সেকেন্ডে দুই কুইন্টিলিয়ন হিসাব করতে সক্ষম ইআই। মিলিয়ন, বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন, কোয়াড্রিলিয়ন পার করে আরও তিনটি শূন্য, মোট ১৮টি শূন্য যোগ করে হয় কুইন্টিলিয়নের হিসাব। অবশ্য বিশ্বের প্রথম শক্তিশালী এক্সা-স্কেল সুপার কম্পিউটার হিসেবে ২০২২ সালে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে এইচপির ‘ফ্রন্টিয়ার’ সুপার কম্পিউটিং সিস্টেম, যা চলতি ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও দ্রুতগতির সুপার কম্পিউটার বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ অ্যাডভান্স হিসেবে পরিচিত। এর গতি প্রতি সেকেন্ডে ২.০৫৫ এক্সা-ফ্লপ (এফএলওপিএস) স্পিড। এফএলওপিএস অর্থ হচ্ছে ফ্লোটিং-পয়েন্ট অপারেশনস পার সেকেন্ড। ফ্লপসের হিসাবটি এ রকম : কিলো-ফ্লপস (১০৩), মেগা-ফ্লপস (১০৬), গিগা-ফ্লপস (১০৯), তেরা-ফ্লপস (১০১২), পেটা-ফ্লপস (১০১৫), এক্সা-ফ্লপস (১০১৮), জেটা-ফ্লপস (১০২১), ইয়টা-ফ্লপস (১০২৪), রোনা-ফ্লপস (১০২৭), কোয়েটা-ফ্লপস (১০৩০) ইত্যাদি। প্রতি সেকেন্ডে ফ্লোটিং পয়েন্ট অপারেশন (ফ্লপ) হলো কম্পিউটিংয়ে কম্পিউটারের কর্মক্ষমতার একটি পরিমাপ। এটি বোঝার জন্য শুরুতেই জানতে হবে ফ্লোটিং পয়েন্ট অপারেশনস পার সেকেন্ড বা এফএলওপিএস সম্পর্কে। বাইনারি ডিজিটকে যেমন সংক্ষেপে আমরা বিট বলি, তেমনি একেও চাইলে উচ্চারণের সুবিধার্থে ফ্লপস বলা যেতে পারে। এটি দিয়েই নির্ধারিত হয়, কম্পিউটারের শক্তি আসলে কতটা। আজকালকার সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারেরও গতি হলো এক্সা-ফ্লপস মাত্রার। এর অর্থ হলো, ১ সেকেন্ডে ১ কুইন্টিলিয়ন গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে মাত্র ৫ মিনিটে। এক (১) কুইন্টিলিয়ন হলো ১ এর পরে ১৮টি ০ (শূন্য)। পরবর্তী হিসাবগুলো হলো : কুইন্টিলিয়নের পর সেক্সটিলিয়ন, তারপর সেপ্টেলিয়ন অর্থাৎ আরও ছয়টি, মোট ২৪টি শূন্য যোগ করলে এক সেপ্টেলিয়ন। বর্তমানে সারা বিশ্ব প্রচলিত থাকা কোনো হাইস্পিড সুপার কম্পিউটার এখন পর্যন্ত জেটা-ফ্লপস (১০২১), গতি অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু জাপান সাম্প্রতিক সময়ে অতি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নতুন প্রজন্মের (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর জেটা-ফ্লপস গতি ‘জেটা-ক্লাস’ সুপার কম্পিউটার তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। যখন একটি সুপার কম্পিউটার ১ জেটা-ফ্লপস গতিতে কাজ করতে সক্ষম হবে, তখনই সেটি হবে জেটা ক্লাস কম্পিউটার। ১ জেটা-ফ্লপস হলো ১ সেকেন্ডে ১ সেক্সটিলিয়ন গণনা সম্পন্ন করা। ১ সেক্সটিলিয়ন হলো ১ এর পর ২১টি ০ (শূন্য)। ‘জেটা-ক্লাস’ সুপার কম্পিউটার বর্তমানে প্রচলিত বিশ্বের যে কোনো শক্তিশালী সুপার কম্পিউটিং সিস্টেম অপেক্ষা কমপক্ষে এক হাজার গুণ দ্রুতগতিতে এবং নিখুঁতভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন জাপানের প্রযুক্তিবিদরা।
দেশটি তাদের ভবিষ্যতের এই হাইস্পিড সুপার কম্পিউটারের নাম দিয়েছে ‘ফুগাকু নেক্সট’ সুপার কম্পিউটার। পরিকল্পনামাফিক এক উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টের আওতায় ‘ফুকাগু নেক্সট’ সুপার কম্পিউটার তৈরির কাজ চলতি ২০২৫ সাল থেকে শুরু হবে এবং এটি খুব সম্ভবত ২০৩০ সালের দিকে পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় চালু করার বিষয়ে প্রবলভাবে আশাবাদী তারা। কম্পিউটারটির ডিজাইন তৈরিতে যৌথভাবে কাজ করছে জাপানের বিখ্যাত টেক জায়ান্ট কোম্পানি ফুজিৎসু এবং রিকেন রিসার্চ ইনস্টিটিউট। এর আগে ২০২০ সালে এই দুই টেক জায়ান্ট কোম্পানি যৌথভাবে তৈরি করে ‘ফুগাকু’ সুপার কম্পিউটার এবং এটি ২০২১ সালে ব্যবহারের জন্য চালু করা হয়। ‘ফুগাকু’ সুপার কম্পিউটারের গতি হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ৫৩৭.২১ পেটা-ফ্লপস (আরপিক)। যা কিনা ২০২২ সালের আগপর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের ষষ্ঠ শীর্ষস্থানীয় সুপার কম্পিউটিং সিস্টেম হচ্ছে ‘ফুগাকু’ সুপার কম্পিউটার। এটিকে জাপানের ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল রিসার্চ (রিকেন) এ স্থাপন করা হয়। এর গতি ০ দশমিক ৪৪ এক্সা-ফ্লপস। ‘ফুগাকু’-তে রয়েছে দেড় লাখের বেশি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসিং ইউনিট এবং এটি সেকেন্ডে ৪১৫ কোয়াড্রিলিয়নের (৪ লাখ ১৫ হাজার ট্রিলিয়ন) বেশি গাণিতিক হিসাব সম্পন্ন করতে পেরেছে, যা এর আগে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির সুপার কম্পিউটার ‘সামিট’-এর চেয়ে ২ দশমিক ৮ গুণ বেশি। বোঝাই যাচ্ছে ‘ফুগাকু নেক্সট’-এর প্রসেসিং ইউনিট, কর্মক্ষমতা এবং গতি কেমন হবে। নতুন এই উচ্চাভিলাষী ‘জেটা-ক্লাস’ কম্পিউটিং সিস্টেম প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ব্যয় হতে পারে (প্রাক্কলিত) আনুমানিক মোট ৭৬১ মিলিয়ন ডলার। সফলভাবে ‘জেটা ক্লাস’ সুপার কম্পিউটার তৈরি করতে পারলে সামনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে যাবে জাপান।
লেখক : অধ্যাপক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়