সন্ধ্যা নামার আগেই ফেনী শহরে সড়কে দাপিয়ে বেড়ানো বিভিন্ন যানবাহনের হেড লাইট জ্বলে ওঠে। এক সময় এগুলো নিয়ন আলোর মতো থাকলেও এখন তা রীতিমতো আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে হ্যালোজেন নামের উজ্জ্বল সাদা আলোয় ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। এতে করে সড়কে ঝরছে তাজা প্রাণ।
ফেনী জেলা শহর, উপজেলা এবং পৌরসভাগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার বৈধ, অবৈধ যানবাহন চলাচল করে। এসকল বাহনগুলোতে দিনে এবং রাতে চলাচল করে লাখ লাখ মানুষ। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ভাবে নাম্বার-প্লেট বিহীন ত্রি-চক্রযান (সি, এন, জি/ অটোরিক্সা) রাস্তায় ছেয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় বিপদের বিষয় হচ্ছে এসব সিএনজি, অটোরিকশা চালকদের বেশির ভাগেরই কোনও লাইসেন্স নেই। যার ফলে বেপরোয়া গতি, বিপদজনক মেনুভারিং, রাতে আপার ডিপারবিহীন অবৈধ হেলোজিং লাইটের ব্যবহার সড়কে সচেতন লাইসেন্সধারি চালকদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। শহর এলাকার চেয়ে এসব বেপরোয়া চালকদের দৌরাত্ম্য বেশি পরিলক্ষিত হয় আন্তঃউপজেলা সংযোগ সড়কগুলোতে। এতে করে অনেক দুর্ঘটনা সংগঠিত হচ্ছে। অসংখ্য প্রাণহানি ঘটেছে প্রতিনিয়ত। এ নিয়ে বিরক্ত জেলার বাসিন্দারা।
শহরের টেকনিক্যাল এলাকার মোটরসাইকেল চালক শান্ত রহমান জানান, সম্প্রতি মহিপাল সড়ক হয়ে বাসায় ফিরছিলাম। সরকারি কলেজ পার হওয়ার পর হঠাৎই বিপরীত দিক থেকে আসা একটি গাড়ির তীব্র সাদা আলোয় ডানে-বায়ে বা সামনে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। অনেকটা আন্দাজে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ নেই। ওই সময় সড়কে গাড়ি কম থাকায় কোনও দুর্ঘটনায় পড়তে হয়নি।
পথচারী হাসনাত ভূঁইয়া বলেন, সন্ধ্যা নামা মাত্রই রাস্তায় শুরু হয় যানবাহনগুলোর অবৈধ আলোকসজ্জার বেপরোয়া প্রদর্শনী। বিরক্ত আর আতংকে রাস্তায় চলাচল করতে হয়। আনোয়ার হক নামের আরেক মোটরসাইকেল চালক বলেন, বড় বড় বাস ও ট্রাকসহ সব গাড়িতে এখন তীব্র আলোর এলইডি লাইট ব্যবহার করা হয়। এতে রাস্তায় মোটরসাইকেল চালাতে অনেক সমস্যা হয়। মাঝে মধ্যে বাইক থামিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। বড় বাস ও ট্রাক যাওয়ার পর আস্তে আস্তে যেতে হয়। কারণ এই তীব্র আলোর কারণে রাস্তা দেখা যায় না। একটু বেগতিক চালালেই বাস ও ট্রাকের নিচে চাপা পড়তে হবে।
পরিসংখ্যান বলছে এসব বেপরোয়া গতির গাড়ি এবং চালকদের কারণে ২০২৪ সালে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ফেনী ছাগলনাইয়া শুভপুর সড়ক ও ফেনী ফুলগাজী পরশুরাম সড়কে স্কুলগামী কোমলমতি শিশু, বয়োবৃদ্ধ ও নারীসহ ৪১ জন মানুষ অকালে প্রাণ হারিয়েছে। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেই চলছে এসকল কারণে। অনেক সিএনজি, অটোরিকশা চালক নিজেও দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে, অনেকেই বিকলাঙ্গ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কেন এই হ্যালোজিং লাইট ব্যবহার করেন তারা তার সদউত্তর দিতে পারেনি চালকরা।
তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে জানা গেছে, নাম্বারবিহীন সিএনজি, অটোরিকশাগুলো কোনও দুর্ঘটনা ঘটালে, নাম্বার-প্লেট না থাকার কারণে এদের কোনও পরিচয় বের করা যায় না। ফলে ভুক্তভোগীরা বাহনগুলোর হদিস পায়না। এতে করে ভুক্তভোগীরা অপরাধীর বিরুদ্ধে যথাযত আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহণ করতেও বাধাগ্রস্ত হয়। যার ফলে দুর্ঘটনা ঘটানো চালক ও গাড়িগুলো থেকে যায় আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
চক্ষু চিকিৎসক ডা. হেমন্ত কুমার বলেন, এলইডি লাইটের শুধু সাদা আলো না, যে কোনও আলো সরাসরি চোখে লাগলে সেটা ক্ষতিকর। এলইডি লাইটের সাদা আলো মানুষের চোখে পড়লে চোখের কর্নিয়ার সমস্যা হতে পারে। এছাড়া চোখে কম দেখা, ঝাপসা দেখাসহ বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
এই বিষয়ে ফেনী জেলা ট্রাফিক বিভাগের টিআই প্রশাসন এসএম শওকত হোসেনের বলেন, গাড়িতে অবৈধ হ্যালোজিং লাইট এবং অবৈধ সিএনজি এবং চালকদের মামলা দিয়েও কূলকিনারা করা যাচ্ছে না। বহুবার সতর্ক করা হয়েছে যানবাহন চালকদের। ভেঙে দেওয়া হয়েছে এলইডি লাইট। তবুও লোকজন সচেতন হচ্ছে না। তবে দ্রুত একশনে যাওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ