অমর একুশে বইমেলার ১৫তম দিনেও গতকাল জনস্রোত অব্যাহত ছিল। টিএসসি, রমনা কালিমন্দির ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন প্রবেশদ্বারসহ বইমেলায় প্রবেশের সব ফটকে ছিল বইপ্রেমীদের জটলা। এদিনের মেলা ছিল লোকারণ্য। তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না এদিনের মেলায়। মাত্রাতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে এদিনের মেলায় হাঁটাচলা ছিল কষ্টকর। তবে এই কষ্ট ছিল ভালোলাগার।
লোক সমাগম বেশি হওয়াতে মেলা ছিল ধুলায় ধূসর। বইয়ের প্রতি ভালোবাসায় ধুলার দূষণকে হাসিমুখেই সহ্য করেছেন মেলায় আগতরা। তবে বই বিক্রির চেয়ে সেলফি পার্টির তৎপরতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কারণে সকাল ১১টার পরিবর্তে গতকাল বেলা দুইটায় মেলার প্রবেশদ্বার খোলা হয়। আর বন্ধ হয় রাত ৯টায়। মেলার প্রবেশদ্বার খোলার পর থেকে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি স্টল ও প্যাভিলিয়নের সামনে ছিল বইপ্রেমীদের উপচে পড়া ভিড়। বিক্রিতে ব্যস্ততার কারণে দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছিলেন না বিভিন্ন স্টল ও প্যাভিলিয়নে কর্মরত বিক্রয়কর্মীরা। ১৫তম দিনের লোকারণ্য মেলায় বই কেনার দৃশ্য মেলাকে এগিয়ে নিয়েছে সফলতার দ্বারপ্রান্তে।
বিকালে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কথা হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা জোনাকী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মঞ্জুর হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, মেলায় প্রচুর লোক সমাগম ঘটেছে। এটা নিঃসন্দেহে ভালো দিক। তবে সেলফি তোলার হিড়িক যত বেশি বই কেনার হিড়িক যদি তার অর্ধেকও থাকত তাহলে প্রকাশকরা অনেক বেশি লাভবান হতেন। আর প্রকাশনা শিল্পও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেত। অনেকে আছেন আমাদের স্টলকে পেছনে রেখে সেলফি তুলতে গিয়ে জটলা পাকায়। যার কারণে বিক্রিতে ব্যাঘাত ঘটে। নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে সেলফি তুললে আমাদের সমস্যা হতো না। একেবারে স্টলে ঝুঁকে গিয়েই সেলফি তোলে। আমি তাদের অনুরোধ জানাব সেলফি তোলার পাশাপাশি তারা যেন অন্তত একটা করে বই কেনে। এতে একুশের শানিত চেতনায় ঋদ্ধ বইমেলা সফলতার পথে এগিয়ে যাবে।
শাহজী প্রকাশনীর শরীফুল ইসলাম শাহজী বলেন, বিক্রি আশাতীত। তবে মূলধারার সাহিত্যের তুলনায় ফেসবুক সেলিব্রিটি আর কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বই বেশি বিক্রি হচ্ছে। এটা একুশের শানিত চেতনায় ঋদ্ধ বইমেলার জন্য অশনিসংকেত। শুধু বইমেলার জন্যই নয়, গোটা সাহিত্যাঙ্গনের জন্যও হুমকি।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপ-বিভাগের তথ্যমতে, গতকাল একুশে বইমেলার ১৫তম দিনে নতুন বই প্রকাশ হয়েছে ১৭৫টি। আর গত ১৫ দিনে মেলায় মোট নতুন বই এসেছে ১ হাজার ৪২৭টি।
শফিক রেহমানের সঙ্গে প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্যের চুক্তি : বরেণ্য সাংবাদিক শফিক রেহমানের ১২টি বই প্রকাশ করছে শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য।
শুক্রবার ভালোবাসা দিবসে রাজধানীর হোটেল শেরাটনে ঐতিহ্যর প্রধান নির্বাহী ও স্বত্বাধিকারী আরিফুর রহমান নাইমের সঙ্গে শফিক রেহমানের ১২টি বইয়ের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে আরিফুর রহমান নাইম বলেন, শফিক রেহমানের লেখা বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে নিয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় পাঠকদের কাছে সমাদৃত। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, তিনি ঐতিহ্যকে যোগ্য মনে করে বইগুলো প্রকাশ করতে দিয়েছেন।
শফিক রেহমান বলেন, আমি আমার লেখালেখির মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের যাপিত জীবন এবং সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরতে চেয়েছি। ‘ঐতিহ্য’-এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আশা করি আমার লেখাগুলো পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে এবং ২৪-এর অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের চিন্তার নতুন দ্বার উন্মুক্ত করবে।
যে ১২টি বইয়ের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সেগুলো হলো- ফেরারী চোখে, মৃত্যুদ-, সংগ্রামী নেত্রী খালেদা জিয়া, রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান, ন্যাশনাল ক্যামপেইন সিরিজ - সাধারণ নির্বাচন ২০০১, বিধ্বস্ত দেশ বিপন্ন মানুষ, চট্টগ্রাম পোলো গ্রাউন্ড লুণ্ঠন, যায় যায় দিন, নেড়িকুকুরের কা-, ভালোবাসা, সমারসেট মম’র-বৃষ্টি ও স্ত্রীভাগ্য।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে শফিক রেহমানের সহধর্মিণী, বেসরকারি সংস্থা ডেমোক্রেসিওয়াচের নির্বাহী পরিচালক তালেয়া রেহমান, ইস্টিশন কমিউনিকেশনসের সিইও রুদ্র হক, হোটেল শেরাটনের সিইও শাখাওয়াত হোসেন, দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার নির্বাহী কর্মকর্তা সজিব ওনাসিস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অদম্য শিখার প্রকাশনা
‘অদম্য শিখা’ নামের একটি অনুপ্রেরণামূলক চিঠি সংকলনের বই প্রকাশ করেছে মোরাল প্যারেন্টিং পরিবার। এটি তাদের প্রথম প্রকাশনা।
বৃত্তিপ্রাপ্ত মোরাল চাইল্ড ও বৃত্তি প্রদানকারী মোরাল প্যারেন্টদের মধ্যে নিয়মিত পত্র যোগাযোগ হয়। নিয়মিত চালিত চিঠিগুলোর মধ্য হতে কিছু অদম্য শিখা চিঠি সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই চিঠিগুলোতে মোরাল চাইল্ডদের বাস্তব জীবনে পারিবারিক অভাব অনটন, কষ্ট ও সংগ্রামের কথা এবং শত বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে তাদের স্বপ্ন পূরণে লেগে থাকার দৃঢ় মনোভাব ছবির মতো ফুটে উঠেছে। গতকাল বিকালে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
এতে অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা, একাডেমির সাবেক পরিচালক ও বিশিষ্ট ফোকলোরবিদ শাহিদা খতুন, মোরাল প্যারেন্টিংয়ের প্রতিষ্ঠিাতা ড. মাহবুবর রহমান ও বইটির সম্পাদক কাজী শহীদুল ইসলাম প্রমুখ।