সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কোলাহল আর চেঁচামেচি কম থাকলেও ছিল উচ্ছ্বাস। সেলফি তোলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বই কেনায় ব্যস্ত ছিলেন অমর একুশে বইমেলায় আগতরা। বেশির ভাগ স্টল ও প্যাভিলিয়নের সামনেই ছিল পাঠকদের ভিড়। তবে বরাবরের মতো ভিড় বেশি ছিল ঐতিহ্য, তাম্রলিপি, জোনাকী প্রকাশনী, আদর্শ, বাংলা প্রকাশ ও মিজান পাবলিশার্সের সামনে। অমর একুশে বইমেলার পঞ্চম দিনে গতকাল এমন চিত্রই ছিল মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে। এদিন জোনাকী প্রকাশনীর সামনে কথা হয় রাজধানীর মিরপুর থেকে আগত দুই সহোদরা শিক্ষার্থী লুসি ও লুবাবার সঙ্গে। তারা বলেন, মেলায় এসে খুবই ভালো লাগছে। তবে পরিবেশটা অগোছালো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা ঢিলেঢালা দেখে খুবই খারাপ লাগছে। চেক করা ছাড়া যে কেউ ঢুকে যাচ্ছে। বিষয়টিতে বাংলা একাডেমির নজর দেওয়া উচিত। এই দুই বোন জানান, তারা সাধারণত উপন্যাসই বেশি পড়ে থাকেন। তবে বেশ কয়েকটি সায়েন্সফিকশনের বই ও মোটিভেশনাল বই কিনেছেন বলেও জানালেন তারা। এদিন বিকালে মেলা প্রাঙ্গণে দেখা হয় বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশার সঙ্গে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর একদলীয় শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্ত মত ও পথগুলো বন্ধ করে রেখেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার। এখন প্রকাশকরা স্বাধীনভাবে তাদের বইগুলো প্রকাশ করতে পারছেন। এটি আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি। আমরা আশা করছি এবারের মেলা আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, জাতির মেধা ও মননের যথার্থ বিকাশের জন্য প্রকাশনাকে শিল্প ঘোষণা করা যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রকাশক কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করাও সময়ের দাবি।
গতকাল মেলার পঞ্চম দিনে নতুন বই এসেছে ৯৮টি। এখন পর্যন্ত মেলায় মোট নতুন বই এসেছে ১৯০টি।
মূলমঞ্চ : বিকালে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘হোসেনউদ্দীন হোসেন : প্রান্তবাসী বিরল সাহিত্য-সাধক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আহমেদ মাওলা। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আবুল ফজল। সভাপতিত্ব করেন শহীদ ইকবাল।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি আতাহার খান এবং আলমগীর হুছাইন। আবৃত্তি করেন রানা আহমেদ এবং কাজী সামিউল আজিজ। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী বুলবুল ইসলাম, মো. আরিফুর রহমান, তাপসী রায়, পাপড়ি বড়ুয়া, ফারাহ হাসান মৌটুসী, মো. হারুনুর রশিদ, কামাল আহমেদ এবং নুসরাত বিনতে নূর।
সংবাদপত্রে জুলাই অভ্যুত্থান : আহম্মদ ফয়েজের রচনায় ‘সংবাদপত্রে জুলাই অভ্যুত্থান’ নামের বই প্রকাশ করেছে প্রকাশনা সংস্থা আদর্শ। বইটিতে ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের ঘটনাগুলো দিনলিপি আকারে তুলে ধরা হয়েছে। সেই সঙ্গে ২৫টি শীর্ষ দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার ছবিও এতে সংযুক্ত করা হয়েছে। গতকাল বিকালে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ, প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, বইটির লেখক ও প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব আহম্মদ ফয়েজ, বইটির প্রকাশক ও আদর্শের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহাবুব রাহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারতের কাছে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জবাবদিহি চাইবে সরকার। ভারতে থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার, রাজনৈতিক মিটিং করার দায় ভারত সরকারকে নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের জায়গা থেকে, কূটনৈতিক জায়গা থেকে, আইনি জায়গা থেকে ভারতের কাছ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাইব। কিন্তু শেখ হাসিনা সেখানে থেকে যদি রাজনৈতিক কর্মকান্ড করেন এর দায় ভারত সরকারকে নিতে হবে। ভারতে থেকে যদি বক্তব্য প্রচার করেন, রাজনৈতিক মিটিং করেন, এটার দায় অবশ্যই ভারত সরকারকে নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা মাঠে আছি। ফেব্রুয়ারি-মার্চ ছাত্র-জনতা মাঠে থাকবে। রাজপথ তাদের দখলেই থাকবে। আমাদের প্রতিরোধ আমরা অব্যাহত রাখছি। যে কোনো সময়ের জন্যই আমরা প্রস্তুত।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ওই সময়টায় সংবাদপত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া একেবারেই সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। গুম থেকে ফিরে আসার পর জানতাম না এর ভিতর কী ঘটেছিল। কয়েকটি পত্রিকা কিনে নিয়ে এসে ঘটনাগুলো জানতে পারি। ওই সময় অনেক পত্রিকার ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। আবার নেতিবাচক ভূমিকাও ছিল। কোনো কোনো পত্রিকা আন্দোলনকে সংঘর্ষ হিসেবে দেখিয়েছে। সেই সময়ের অনেক রিপোর্ট এখন সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘আন্দোলনের সময় পত্রিকাগুলো যে ব্যবহৃত হয়েছে বা সেলফ সেন্সরশিপের মুখোমুখি হয়েছে, সেটা এখন তাদের প্রকাশ করা উচিত। নয়তো তারা আস্থা অর্জন করতে পারবে না। মিডিয়ার ওপর মানুষের অনাস্থা ও ক্ষোভ তা দূর হবে না।