চট্টগ্রামে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বার্মা সাইফুল বাহিনী। নগরীর পাঁচলাইশ, বায়েজিদ ও খুলশী এলাকায় এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে এ বাহিনী। খুন, জায়গা দখল, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, অপহরণ থেকে শুরু করে নানা অপকর্ম করে যাচ্ছে বার্মা সাইফুল বাহিনী। সর্বশেষ গত ২৫ জানুয়ারি শনিবার মন্দিরের পুরোহিত-সেবকসহ তিনজনকে অপহরণ করে সাইফুল বাহিনী। এরপর তাদের মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছে দাবি করা হয় ৯ লাখ টাকা। যদিও একদিন পর পুলিশ অপহৃত তিনজনকে উদ্ধার করে এবং গ্রেপ্তার করা হয় সাইফুল বাহিনীর চারজনকে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম চলছে। বার্মা সাইফুল বাহিনীর অনেক সদস্য ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার ভাই সবুজকেও আমরা গ্রেপ্তার করেছি।’ তিনি বলেন, ‘কে কোন দল সেটা আমাদের বিবেচ্য নয়, আমাদের কাছে সন্ত্রাসী যে সে সন্ত্রাসীই। তার অন্য কোনো পরিচয় মুখ্য না।’
জানা যায়, নগরীর বায়েজিদ থানার বার্মা কলোনির নুরুল আমিন কসাইয়ের তিন ছেলে সবুজ, সাইফুল ইসলাম ও ফাহিম। তিন ভাইয়ের রয়েছে আলাদা তিনটি বাহিনী। তারা জায়গা দখল, মাদক কারবার থেকে মানুষ খুন পর্যন্ত করে আসছে অর্থের বিনিময়ে। দুই ভাই বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ১১ অক্টোবর বায়েজিদ থানার শান্তিনগরে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় মোহাম্মদ ইমন নামে এক যুবক নিহত হন। ওই ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুই ভাইকে বহিষ্কার করা হয়। সবুজ ছিলেন পাঁচলাইশ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আর সাইফুল ইসলাম নগর ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক। দুই ভাই নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেলের অনুসারী। গত বছর ২৪ নভেম্বর হাটহাজারী থানার কুয়াইশ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে সবুজকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় ৩৫টির বেশি মামলা রয়েছে। সাইফুলের বিষয়ে জানতে চাইলে নগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেল বলেন, রাজনীতি করার কারণে ছাত্রদলে আমার হাজারো কর্মী আছে। ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে তাকে যখন পুলিশ গুলি করেছিল, তখন তাকে হেল্প করেছি এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাকে পা লাগাতে সহযোগিতা করেছে।
তার বিরুদ্ধে যে সব অপকর্মর কথা বলা হচ্ছে, তার কারণে তাকে বহিষ্কার করার সুপারিশ আমিই করেছি। পার্টি তাকে বহিষ্কার করেছে, এখন আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে।
স্থানীয়রা জানান, সবুজ, সাইফুল ও ফাহিমের গড়ে তোলা সন্ত্রাসী বাহিনীর অত্যাচারে বায়েজিদ-পাঁচলাইশ-খুলশীসহ নগরের বাসিন্দারা অতিষ্ঠ। প্রকাশ্যে চাপাতি ও কিরিচ হাতে মহড়া কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো তাদের যেন নিত্যদিনের ঘটনা।
মূলত বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে এবং প্রতিষ্ঠানে গিয়ে চাঁদাবাজি-লুটপাট করতেই তারা এ বাহিনী গড়ে তুলেছে। বার্মা সাইফুল ও তার ভাই বার্মা সবুজ বায়েজিদ বোস্তামী থানার বার্মা কলোনি, হিলভিউ, মোহাম্মদনগর, আমিন জুট মিলস, আলীনগর, পাঁচলাইশ থানাধীন ফরেস্ট, রংপুর কলোনি ও হামজারবাগ এলাকায় ত্রাস হিসেবে পরিচিত। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে তাদের চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি চলতে থাকে। ২০২১ সালে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে বার্মা সাইফুল গুলিবিদ্ধ হন এবং তার এক পা কেটেও ফেলতে হয়েছে। আর পা কেটে ফেলায় বিএনপি থেকে সহানভূতি পান, এরপর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তার বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মারামারি, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে ৩৫টিরওবেশি মামলা রয়েছে।
গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে চাঁদা না পেয়ে খুলশী থানার কর্ণফুলী কাঁচাবাজারে সামনের রেললাইনে বসা দুই দোকানি আলাউদ্দিন ও রাশেদকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করেন সাইফুল ও সবুজের দলের লোকজন। একই বছরের ২৯ অক্টোবর দুপুরে বায়েজিদের কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকায় সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটি রোডে বার্মা সাইফুল ও তার ভাই সবুজ গ্রুপের সঙ্গে নগর যুবদল নেতা মাহবুব রহমানের গ্রুপের সংঘর্ষ হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে হিলভিউ এলাকায় ইয়াবার মাসোহারা কেন্দ্র করে বার্মা সবুজের নেতৃত্বে অন্তত পাঁচটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়। বাধা দিলে আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাবু নামে এক যুবককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। সন্ত্রাসীরা অস্ত্র নিয়ে মিছিল করে ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ ছাড়া ১৩ জানুয়ারি বিকালে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে বার্মা সাইফুলের অনুসারীরা লাঠি ও কিরিচ নিয়ে ষোলশহর এলাকায় শোডাউন করে। খবর পেয়ে পাঁচলাইশ থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শহীদুল ইসলামের লোকজন এসে তাদের বাধা দেয়। এতে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুই গ্রুপ। নাছির নামে একজনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।