চট্টগ্রামে বেসরকারি কারা পরিদর্শক পদে এবারও প্রাধান্য পেয়েছে দলীয় বহর। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বৃহস্পতিবার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১২ জন বেসরকারি কারা পরিদর্শক। এর মধ্যে অন্তত নয়জন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অথচ অলাভজনক এ পদে নিয়োগে প্রাধান্য দেওয়ার কথা সমাজসেবার মানসিকতাসম্পন্ন সচ্ছল ব্যক্তিদের। অথচ দলীয় কর্মীদের এ পদে নিয়োগের ফলে কারাবন্দিদের সেবার বিষয়টি বিগত সময়ে ছিল উপেক্ষিত।
নিয়োগ পাওয়া ১২ জন কারা পরিদর্শকের মধ্যে জোবাইরুল আলম মানিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, চট্টগ্রাম জেলা সমন্বয়ক। সৈয়দ আবুল বশর নগরীর কোতোয়ালি এলাকার বদরপাতি যুব গোষ্ঠী নামে একটি সংগঠনের এবং প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন আলহাজ শামসুল হক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। তাঁরা বিভিন্ন সময়ে সমাজসেবামূলক কর্মকাে সম্পৃক্ত থাকেন।
বাকি নয়জনের মধ্যে আমিনুল ইসলাম তৌহিদ কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সদস্য, মোজাম্মেল হক দক্ষিণ জেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, নাসির উদ্দিন নগর যুবদলের বিলুপ্ত কমিটির সহবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক, আতাউল্লাহ সম্রাট কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য, আবদুর রাজ্জাক নগর যুবদলের বিলুপ্ত কমিটির সহসভাপতি, জাফর আহম্মদ চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য, উজ্জল বরণ বিশ্বাস হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক, কামরুন নাহার লিজা মহানগর মহিলা দলের যুগ্মসম্পাদক ও সুলতানা বেগম নগর মহিলা দলের সাবেক যুগ্মসম্পাদক।
জানা গেছে, কারাগারে বন্দিদের দেখভালের জন্য দুই বছর পর পর ১২ জনকে এ দায়িত্ব দেন বিভাগীয় কমিশনার। তাঁর কাছে নামপ্রস্তাব সুপারিশ করেন জেলা প্রশাসক। সমাজের ভদ্র, গণ্যমান্য, শিক্ষিত ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরাই কারা পরিদর্শক হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। কারাভ্যন্তরে বন্দিদের সঙ্গে কথা বলে কারাগারের পরিবেশ, খাবারের মান পরীক্ষা, মাদক সমস্যা, অসুস্থতায় বন্দিদের সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে কি না, শাস্তির অপপ্রয়োগ হচ্ছে কি না, কোনো বন্দি মিথ্যা মামলায় আটক আছেন কি না, বিনামূল্যে সরকারি খরচে অসহায় বন্দিদের মামলা চালানোর পদ্ধতি সম্পর্কে জানানো, কারাগারের ব্যবস্থাপনার খোঁজ নেওয়াসহ বন্দিদের কল্যাণে কাজের দায়িত্ব থাকে বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের।
আওয়ামী লীগের আমলে বেসরকারি কারা পরিদর্শক পদে নিয়োগ পেতেন ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও তাঁদের সমমনা লোকজন। তাঁরা বন্দিবাণিজ্য, কারাগারে দলীয় নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন সুযোগসুবিধা পাইয়ে দেওয়া, কারাভ্যন্তরে মাদক সরবরাহসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘কারা পরিদর্শক পদে দলীয় নিয়োগ আমরা আগেও দেখেছি। এ ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, শুধু চেহারা ছাড়া।’
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্ ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আইনজীবী এ এম জিয়া হাবিব আহসান বলেন, ‘কারা পরিদর্শক এখন পলিটিক্যাল পদ হয়ে গেছে। কারাগার, মানবাধিকার এবং কারাবন্দিদের নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, যাঁদের পরিকল্পনা আছে; তাঁদের কাউকে রাখা হয়নি। আমি মনে করেছিলাম বৈষম্যবিরোধী সরকার একজন মানবাধিকারকর্মী অথবা একজন সাংবাদিককে ওখানে রাখবেন। যেন আমরা তথ্য এবং সমস্যা জানতে পারি। সমাধানের পথ খুঁজতে পারি। এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক বিষয়। নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাইলে এ বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’