দেশে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরে পড়ছে বহু তাজা প্রাণ। ঘর থেকে বের হয়ে গন্তব্যস্থলে না পৌঁছে লাশ হয়ে ঘরে ফিরছে। চালকের অসাবধানতা, অদক্ষতা, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন, গাড়ির প্রতিযোগিতা, রাস্তার দুরবস্থাসহ নানাবিধ কারণেই সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। এসব দুর্ঘটনায় হাসপাতালের বেডে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে পঙ্গুত্ববরণ করা অসংখ্য মানুষ। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় প্রতিনিয়ত ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ। ১০ মার্চ সকালে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ঢাকা-টাঙ্গাইল যমুনা সেতু মহাসড়কের কামাক্ষার মোড় এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছে। দুজনই মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী ছিলেন। ৭ মার্চ রাতে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের জালালাবাদ থানার বলাউড়া বাজারে বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন। ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে নওগাঁ-বগুড়া আঞ্চলিক সড়কের দুপচাঁচিয়া মেইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নওগাঁ থেকে বগুড়াগামী দ্রুতগামী গরুবাহী একটি ট্রাক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দিলে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এ কয়েকটি ঘটনা মাত্র। এভাবে রাজপথ যেন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ৬ হাজার ৩৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৫৪৩ জন নিহত এবং ১২ হাজার ৬০৮ জন আহত হয়েছে। এই সময়ে ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ১৫১ জন আহত হয়েছে। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ৫ হাজার ৮৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৮০ জন নিহত ও ৬ হাজার ৪৬২ জন আহত হয়েছে। আর চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৮৬৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮৪৪ জন নিহত ও ১ হাজার ২২৭ জন আহত হয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে মোট ৫৯৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫৭৮ জন এবং আহত ১ হাজার ৩২৭ জন।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সাধারণত ফুটপাত দখল, সড়কের ধারে বাজার ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড, ওভারটেকিং, ওভারস্পিড ও ওভারলোড, চালকের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব; হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, রাস্তাঘাটের নির্মাণত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রীদের অসতর্কতা, ট্রাফিক আইন না মানা, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জেব্রা ক্রসিং না থাকা এবং জেব্রা ক্রসিং গাড়িচালক কর্তৃক না মানা, অরক্ষিত রেলক্রসিং, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার করে কথা বলা, মহাসড়কে স্বল্পগতি ও দ্রুতগতির যান একই সঙ্গে চলাচল, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো এবং মহাসড়ক ক্রসিংয়ে ফিডার রোডে যানবাহন উঠে যাওয়াই মূলত দায়ী। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৫০টির মতো কারণ রয়েছে উল্লেখ করে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সড়কনিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা, দেশের সড়ক-মহাসড়কে রোড সাইন, রোড মার্কিং (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন করা, জেব্রা ক্রসিং অঙ্কন ও আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা, চালকদের অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, অনিয়ম-দুর্নীতি ও সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স প্রদানের পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়ন করা, দেশব্যাপী মানসম্মত নতুন বাস সার্ভিস চালু করা, সড়কের মিডিয়ানে উল্টো পথের আলো এবং পথচারীর পারাপার রোধে মহাসড়কের রোড ডিভাইডার পর্যাপ্ত উঁচু করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এককভাবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দায়ী করলে চলবে না।
পরিবহন মালিক-শ্রমিক, হাইওয়ে পুলিশ ও বিআরটিএকে যৌথভাবে দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় করে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্ঘটনায় দোষীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকার বদল হলেও পরিবহনের কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন আসেনি। চাঁদাবাজির হাতবদল হয়েছে কেবল, ফিটনেসহীন যানবাহন সড়কে চলছে, আইনের অপপ্রয়োগ চলছে, বিআরটিএ রাজস্ব আদায়ে ব্যস্ত, ট্রাফিক বিভাগ জরিমানা আদায়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার যাবতীয় উপাদান সড়কে বিছিয়ে রাখা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে এবং সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষার্থে পেশাদারির সঙ্গে আইনের নিরিখে দায়িত্ব পালন করে থাকে। সড়ক দুর্ঘটনা ও সড়কে বিশৃঙ্খলার পেছনে বেশ কিছু বিষয় অনেকাংশে দায়ী। দুর্ঘটনাপ্রবণ যানবাহন, লাইসেন্সধারী ও লাইসেন্সবিহীন বেপরোয়া চালক, ড্রাইভার ও পথচারীদের আইন না মানার প্রবণতা এর মধ্যে অন্যতম।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্প সমন্বয়কারী শারমিন রহমান জানান, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রথমে প্রয়োজন একটি উপযুক্ত আইন, যা বাংলাদেশে নেই। বাংলাদেশে দেখা যায়, বেশির ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় গতির কারণে। তাই দেশের সড়ক পরিস্থিতির কথা ভেবে নিরাপদ গতি নির্ধারণ করা উচিত।