চারপাশে প্রতিদিন যা ঘটে চলেছে, তার মধ্যে সুসংবাদের অংশ সামান্য। বেশির ভাগ খবরই নৈরাশ্যজনক। যানজটে নাকাল নগর ও নগর উপকণ্ঠের মানুষ। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মবোক্র্যাসি, ধর্ষণ, মিছিল, খুনখারাবি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, আন্দোলন-সংগ্রাম ও শয়তান শিকার অভিযান চলছে যেন পাল্লা দিয়ে। অন্যদিকে জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ঐক্যের যে পাটাতন তৈরি হয়েছিল, তাতেও ফাটল ধরেছে, প্রতীয়মান হয়। কে কার কোন পারপাস সার্ভ করতে চাইছে, সে এক কঠিন ধাঁধা।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধান বলছে, সারা দেশে অপরাধকর্ম সংঘটনের পেছনে কাজ করছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আরও দুয়েকটি গোপন সংগঠন। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নানা কৌশলে অপরাধীদের মাঠে নামাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা নিজেরাও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও বলেছেন, দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পতিত স্বৈরাচার বিপুল অর্থ ঢালছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতাকালে তিনি এই মন্তব্য করেন।
এরূপ পর্যবেক্ষণ অমূলক হয়তো নয়। গণ অভ্যুত্থানের মুখে পরাজিত ও পলায়নপর শক্তি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা করতেই পারে। পাশাপাশি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে নেমে পড়তে পারে জাত অপরাধীরাও। রাজনৈতিক দল, এনজিও, সুশীল, সমন্বয়ক, ধার্মিক নানা রঙের চাদর পরে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত মতলব হাসিলের চেষ্টাও যে চলছে না, তেমনটি বলার কোনো সুযোগ নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে সমস্যাকীর্ণ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব কোন পথে? এই পরিস্থিতি সামলানোর দায়িত্ব প্রথমত ও প্রধানত অন্তর্বর্তী সরকারের। নিজেদের যাঁরা জুলাই অভ্যুত্থানের নায়ক বলে দাবি করেন এবং যাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে প্রথম থেকে নিবিড়ভাবে কাজ করে চলেছেন তাঁদেরও দায়িত্ব এ ক্ষেত্রে কম নয়। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে দেশের ছোটবড় প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ থাকলেও ছাত্রদের কৃতিত্ব দিতে কখনো কোনো দল কার্পণ্য করেনি। এজন্য রাজনৈতিক দল প্রশংসার দাবিদার। কোনো কোনো পার্টি জাতীয় সরকারের কথা বললেও অন্তর্বর্তী সরকারে তারা শরিকানা চায়নি। কিন্তু আন্দোলনের পাইওনিয়াররা চেয়েছিলেন এবং তাঁরা শরিক হয়েছেন। কাজেই তাঁদের কাঁধেও সেই দায়িত্ব বর্তায়। সেই দায়িত্ব কি তাঁরা পালন করতে পারছেন! নাকি পালন করছেন! জনমনে আজ এই প্রশ্নটি প্রবল হয়ে দেখা দিতে শুরু যে করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যদি তা-ই না হবে; সামাজিক মাধ্যমে নেটিজেনদের অনেকে কেন সমন্বয়ক, বৈষম্যবিরোধী- এসব বিশেষণ ব্যবহার করে নেতিবাচক মন্তব্য করছেন? সাম্প্রতিক এক জরিপে ছাত্রদের দলের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে কম বলে ফল পাওয়া গেছে। সম্প্রতি দেশের চৌষট্টি জেলার ১০ হাজার ৬০০-এরও বেশি মানুষের মতামত জরিপ করেছে একটি সংস্থা। তাতে দেখা যায়, দল হিসেবে মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ ছাত্রদের দ্বারা গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিকে সমর্থন করছে। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। কেন এমন হলো?
পক্ষান্তরে জরিপে উত্তরদাতাদের ৪১ শতাংশের পছন্দ বিএনপি, ৩১ শতাংশের পছন্দ জামায়াতে ইসলামী। ১৪ শতাংশ মানুষ এখনো আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে এই জরিপ ফলাফলে বলা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বা জরিপ ফলাফলকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেওয়া জরুরি নয়। মার্ক টোয়েনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখনো অসার প্রমাণিত হয়নি। তিনি বলেছিলেন, মিথ্যা তিন প্রকার; ১. মিথ্যা ২. ডাহা মিথ্যা ৩. পরিসংখ্যান। এই বাণীটি মাথায় রেখেও যে কেউ স্বীকার করবেন, আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের জুলাই-আগস্টের জনপ্রিয়তা এখন আর নেই। যাঁরা ছিলেন তুঙ্গে, তাঁদের জনপ্রিয়তা আজ নিম্নগামী কেন? আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। কবিরা তারুণ্যের জয়গান যতই গেয়ে থাকুন না কেন, দিন শেষে প্রবীণের বৈদগ্ধের শক্তি উপেক্ষা করা বাঞ্ছনীয় নয়।
১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে একদল তুখোড় তরুণ জাসদ গঠন করেছিলেন। তাঁরা মাঠে নেমেছিলেন চকচকে ধারালো সেøাগান নিয়ে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, শ্রেণিসংগ্রাম, লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই। এসব সেøাগানের মধ্যে নতুনত্ব ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল অ্যাডভেঞ্চারিজম, তাত্ত্বিক ভিত্তিও ছিল। চে গুয়েভারাকে তখন জীবনের আইডল বানিয়ে নিয়েছিলেন বাবরি দোলানো অনেক তরুণ। সেই সময়ের তরুণদের মধ্যে দলটি বাস্তবিক পক্ষেই বেশ একটা আলোড়ন তুলতে পেরেছিল। কিন্তু ১৯৭৩ সালের জেনারেল ইলেকশনে মধুপুরে আবদুস সাত্তার ছাড়া জাসদের মশাল মার্কার আর কেউই জিততে পারেননি। অবশ্য বেশ কয়েকটি আসনে কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল। সেবারের নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হিসাবে জাসদ তৃতীয় হয়েছিল। মোট ভোটের মাত্র সাড়ে ৬ শতাংশ পড়েছিল এই দলের মার্কায়।
স্বীকার্য সেই সময়ের জাসদ ও আজকের নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠনের প্রেক্ষাপট এক নয়। জাসদ ছিল কট্টর সরকারবিরোধী। পক্ষান্তরে জাতীয় নাগরিক পার্টি বর্তমান সরকারের নিকটতর। তাদের প্রতিনিধিরা সরকারে আছেন। অনেকে এই দলকে কিংস পার্টি বলছেন। তবে মিলের জায়গাটি হলো জাসদ নতুন সেøাগান দিয়েছিল, এই দলেরও নতুন সেøাগান রয়েছে। তারা চান সেকেন্ড রিপাবলিক। জাসদ চেয়েছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র।
আপাত বিচারে মনে হচ্ছে, জাতীয নাগরিক পার্টি সবার আগে জাতীয় নির্বাচনপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দল ও জনমতের বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিএনপি চাইছে ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যদিও দলটি বলছে, তারা সংস্কারের বিপক্ষে নয়। সুষ্ঠু ইলেকশনের জন্য দরকারি সংস্কারগুলো করে আগে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকার গঠিত হোক। নির্বাচিত সরকার বাকি সব সংস্কার করবে। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। বিএনপির মিত্রদলগুলোর অভিমতও অনুরূপ। বামধারার প্রধান দলগুলোও মনে করে, সংকট উত্তরণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নির্বাচিত সরকার। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমরা আশা করি, সরকার ক্ষমতা আঁকড়ে না থেকে দ্রুত নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবে।’ সিপিবি এ মাসের মধ্যেই ইলেকশনের রোডম্যাপ চায়। বর্তমানে বামধারার রাজনীতি যথেষ্ট বেগবান না হলেও এ কথা অনস্বীকার্য যে এই দলগুলোর নেটওয়ার্ক বিস্তৃত রয়েছে সারা দেশে। নির্বাচন প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামী কৌশলী অবস্থান গ্রহণ করে চলেছে।
পক্ষান্তরে নাগরিক পার্টির প্রধান নাহিদ ইসলাম বিচার, সংস্কার ও গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি আদায়ের জন্য আবারও সম্মিলিতভাবে রাজপথে নামবেন বলে জানিয়েছেন। এই দাবির ব্যাখ্যায় দলের নেতারা বলছেন, তাঁরা সাধারণ নির্বাচন বিলম্বিত করতে চান না। এই পার্টির অন্তত একজন নেতাকে বলতে শুনেছি, জাতীয় সংসদ ও গণপরিষদ নির্বাচন একই দিনে হতে পারে। নাগরিক পার্টির একজন দিন কয়েক আগে বলেছেন, গণহত্যাকারীর বিচারের আগে দলগুলো যেন ইলেকশনের নাম মুখে না আনে। পরে অবশ্য তিনি এই বক্তব্যের ভিন্ন তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। নাগরিক পার্টির সাবেক প্ল্যাটফর্ম থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় ইলেকশনের দাবিও করা হয়েছিল। এদিকে আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টাও চলছে।
সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংলাপের আয়োজন করেছিল সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি। পর্যবেক্ষক মহলের অনেকে বলছেন, সরাসরি, খুব স্পষ্টভাবে ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিপক্ষে অবস্থান না নিলেও যেসব দাবি উঠছে তাতে জাতীয় নির্বাচন আপনাতেই পিছিয়ে যাবে। একজন ইলেকশন কমিশনারও বলেছেন, স্থানীয় সরকার ভোট আগে করতে হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিলম্বিত হবে। সাধারণ নির্বাচন বিলম্বিত করার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, কৌশলগত কিংবা সাদামনে যা যা করা ও বলা হচ্ছে তা জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার পথেও বড় কাঁটা হয়ে দেখা দিতে পারে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ঈদের আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ডায়ালগ শুরু করতে চায়। ৩৪টি রাজনৈতিক দলের কাছে ১৬৬টি বিষয়ে মাল্টিপল চয়েস পদ্ধতিতে মত চাওয়া হয়েছে। কমিশন আশা করেছিল, ১৩ মার্চের মধ্যে সবাই তাদের মতামত জানাবে। তবে সময় চেয়েছে কয়েকটি দল। ঐকমত্য কমিশনের উদ্দেশ্য একটি সর্বসম্মত সনদ তৈরি করা। সংশ্লিষ্ট দলসমূহের প্রতিনিধিরা ওই সনদে স্বাক্ষর করবেন। ইলেকশনের আগে বা পরে সনদ নির্দেশিত সংস্কার করা হবে। সংকট উত্তরণের নিমিত্ত জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নে কেউ দ্বিমত করবে বলে মনে হয় না। কাজেই এই উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। সাধুবাদ জানাই। কিন্তু ‘সালিশ মানি, তালগাছটা আমার’ এই নীতি ধরে রাজনৈতিক পক্ষগুলো সংলাপে বসলে ঐক্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ। নাগরিক পার্টি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণহত্যার বিচার, সংস্কার ও গণপরিষদ গঠনের দাবি নিয়ে রাজপথে আন্দোলন করতে চায়। বিএনপি ও তার মিত্ররাও আন্দোলনে নামবে দ্রুত জেনারেল ইলেকশনের দাবিতে। ফয়সালার জন্য যদি রাজপথই বেছে নেওয়া হয়, তাহলে সংলাপে কী ফল দেবে?
দেশে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা রুখে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সর্বসম্মত সংস্কার চাই, তা চিহ্নিত করে জাতীয় ঐক্যের সনদও দরকার। দেশের মানুষ এখন শান্তি ও স্থিতি চায়, নৈরাজ্যের অবসান চায়, রাজপথের আন্দোলন নয়। জাতীয় ঐক্য জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পথে অন্তর্বর্তী ও ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক