মাদক মরণনেশা। এই নেশায় যারা একবার আসক্ত হয়, তারা তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। এই নেশা আসক্তদের সুপথে ফেরাতে পারে না। এভাবে সমাজে বেড়ে যায় মাদকসেবীর সংখ্যা। এই মাদক এখন দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বিস্তার লাভ করছে। লাখো মানুষ আসক্ত এই মরণনেশায়। মাদকদ্রব্য মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। দেশে এখন কত রকমের মাদক আসছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। ইয়াবা, ফেনসিডিল ও হেরোইন- সর্বনাশা এসব মাদকদ্রব্য পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে যেমন আসছে, তেমনি দেশেও ভেজাল উপকরণ দিয়ে তৈরি হচ্ছে। ফলে একই সঙ্গে মাদক ও ভেজাল দুই ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে সেবনকারীরা। চিকিৎসার মাধ্যমে নেশার থাবা থেকে মুক্তি মিললেও ভেজাল মেশানো মাদক গ্রহণের ক্ষেত্রে সে সুযোগও পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে মৃত্যু বা পঙ্গুত্ববরণ এড়ানো যায় না।
মাদক কেড়ে নেয় মানুষের মনুষ্যত্ব। মাদকাসক্তরা হারায় নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ। মাদকের জন্য এহেন অপরাধ নেই, যাতে তারা পিছপা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাদকাসক্তরা ইতোমধ্যে হুমকি হয়ে উঠেছে। মাদক পাচার দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স সত্ত্বেও এর আগ্রাসন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ইরানসহ দুনিয়ার যেসব দেশে মাদক কারবারে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড সেসব দেশেও এর থাবা বন্ধ হয়নি এটি অতি লাভজনক কারবার হওয়ার সুবাদে। অতিমাত্রায় ক্ষতিকর ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল ‘আইস’ নামে একটি মাদকের সন্ধান মিলেছে সম্প্রতি। এটি স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের মতো ভয়াবহ পরিণতির কারণ হতে পারে। এ ধরনের মারাত্মক ক্ষতিকর মাদক কীভাবে দেশে আসছে, তা অবিলম্বে উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
মাদকদ্রব্য কেনাবেচা ও সেবনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হচ্ছে ভয়ংকর সব অপরাধ। কাজেই মাদকদ্রব্য কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব না হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়বে। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করার পরও দেশে মাদকের ব্যবহার ও পাচার সন্তোষজনক মাত্রায় রোধ করা যায়নি। সরাসরি মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কঠোর সিদ্ধান্তের পরও থামানো যাচ্ছে না মাদকের কারবার। সরকারকে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে হবে। যেকোনো মূল্যে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে হবে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। মাদক কারবারিরা যেমন পাচারের কৌশল পাল্টায়, তেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিচক্ষণ কর্মকর্তাদেরও কৌশলী হতে হবে। তাহলেই তাদের পরাজিত করা সম্ভব। যুবসমাজকে যদি আমরা সুরক্ষা দিতে চাই, অন্যায়-অপরাধ কমাতে চাই, সমাজকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখতে চাই এবং দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চাই, তবে মাদকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই ও বিজয় অর্জনের বিকল্প নেই। দেশ ও সমাজকে মাদকমুক্ত করতে হলে মাদকের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হবে, মাদকের চলাচল বিপণন ও বিক্রি বন্ধ করতে হবে। মাদক চোরাচালান ও কারবারের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে হবে এবং মাদক চোরাচালান ও কারবারের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
মাদকের আগ্রাসন ও অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য শুধু প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি। সামাজিক প্রতিরোধের জন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিই পূর্বশর্ত। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক, সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিতে হবে। সব বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে যদি মাদকের ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা যায় এবং তাদের মধ্যে সচেতনতা আসে তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মাদকাসক্তের সংখ্যা কমবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, আলেম-ওলামা ও সমাজের সচেতন মানুষ নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধির যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল তা জোরদার করতে হবে কমিটি গঠন ও কার্যকর করার মাধ্যমে। এ কর্মসূচি ও কমিটি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারিত করতে হবে।
সরকারকে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি এর সঙ্গে জনসংশ্লিষ্টতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তরুণ প্রজন্মের বিপথগামী ও উচ্ছৃঙ্খল করে তোলার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে মাদক। মাদক চোরাকারবারিদের লক্ষ্যই থাকে তরুণ ও যুবক শ্রেণির দিকে। তারাই তাদের মাদকের প্রধান খরিদ্দার। তারা নিত্যনতুন মাদক চোরাচালান করে তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারা ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা থেকে শুরু করে এখন নতুন সংস্করণ হিসেবে এলএসডি এবং গাঁজার কেক নিয়ে আসছে।
মাদক কারবারিরা অনলাইনে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে এই মাদক বিক্রি করছে। মাদকের কারবার বন্ধ করা না গেলে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব ধরনের স্থিতিই বিঘ্নিত হবে। তাই মাদকের বিস্তার রোধে কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক প্রতিরোধে সরকারকে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও তৎপর হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য