শ্রেষ্ঠা আরিত্রিকা আর আদ্রিকা সৃজা দুই বোন। ওরা স্কুল ড্রেস পরা ছাড়াও সব সময় এক রঙের পোশাক পরে। ওরা এক শ্রেণিতে পড়ে। তৃতীয় শ্রেণিতে। ওরা একসঙ্গে স্কুলে যায়। আজও স্কুলে যাচ্ছে। রাস্তায় এক বৃদ্ধা ওদের বললেন, ‘মামণিরা, একটু দাঁড়াবে?’
দুই বোন একজন অন্যজনের দিকে তাকাল। বোঝা যাচ্ছে ওরা মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিল দাঁড়াবে কি দাঁড়াবে না। তখন বৃদ্ধাটি আবার বললেন, ‘তোমরা কি ভয় পাচ্ছ, নাকি ভাবছ দাঁড়ালে স্কুলে যাওয়ার জন্য দেরি হয়ে যাবে?’
বিনয়ের সঙ্গে শ্রেষ্ঠা আরিত্রিকা বলল, ‘দাঁড়ালে তো দেরি হবেই। কী বলতে চান?’
বৃদ্ধা বুঝতে পারলেন, সত্যিই তো তাই। দাঁড়ালে তো ওদের দেরি হবে। আমি কেন ওদের দেরি করাব? তার চেয়ে ওদের সঙ্গে হেঁটে যেতে যেতে কথা বলি।
আদ্রিকা সৃজা বলল, ‘আপনি কিছু ভাবছেন? কিছু বললে আমাদের সঙ্গে চলুন।’
বৃদ্ধা মনে মনে যা ভাবছেন তাই সৃজা বলে ফেলল। তিনি একটু মুচকি হাসি দিয়ে খুশি হয়ে বললেন, ‘আমিও তাই ভাবছিলাম। তোমাদের পথে দেরি না করে তোমাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে যাওয়াটা ভালো হবে। তোমাদের আর সময় নষ্ট হবে না।’
শ্রেষ্ঠা আরিত্রিকা বলল, ‘আমাদের সঙ্গে আপনি গেলে আপনার আবার দেরি হয়ে যাবে না তো? আমাদের তো স্কুলে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় আছে। নির্দিষ্ট সময় ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হবে।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘তা ঠিক বুঝতে পেরেছি। সে জন্য আমি তোমাদের সঙ্গে যাব। এখানে আর দাঁড়িয়ে দেরি না করি, চল।’
শ্রেষ্ঠা আরিত্রিকা বলল, ‘আচ্ছা। চলুন।’
ওরা তিনজন হাঁটতে লাগল। পেছনে থেকে ওদের বন্ধু অনিক দৌড়ে এসে বলল, ‘আমার দেরি হয়ে গেছে রে।’
শ্রেষ্ঠা আরিত্রিকা বলল, ‘কেন রে?’
অনিক বলল, ‘টেবিলের ওপর স্কেল রেখেছিলাম। আসার আগমুহূর্তে দেখি স্কেল টেবিলে নেই। তাই খুঁজতে দেরি হয়ে গেল।’
আদ্রিকা সৃজা বলল, ‘স্কুল থেকে বাসায় গিয়ে দেখবি, তোর মা ঠিকই স্কেল বের করে রেখেছেন। টেনশন করিস না।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ। স্কেল যদি হারিয়ে যায়, তাহলে দেখবে তোমার মা নতুন করে একটি স্কেল কিনে নিয়ে টেবিলে রেখে দেবেন।’
‘তা ঠিক বলেছেন। মায়েরা এমনই হন। সন্তানের সব ইচ্ছা পূরণ করেন।’
বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে অনিক বলল, ‘আচ্ছা, আপনি আমাদের সঙ্গে কেন যাচ্ছেন? আপনি আমাদের স্কুলের ছাত্রী না, আমাদের স্কুলের শিক্ষকও না।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘কারণ আছে।’
অনিক বলল, ‘কী কারণ?’
বৃদ্ধা বললেন, ‘শ্রেষ্ঠা, তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?’
শ্রেষ্ঠা বলল, ‘এ প্রশ্ন তো সবাই করে দেখি। আমার ইচ্ছার কথা কাউকে বলব না। কারণ আমি এখন যদি একটা হওয়ার কথা বলে রাখি, পরবর্তী সময় যদি হতে না পারি তাহলে মিথ্যা কথা বলা হবে। তাই বলতে চাই না। আমি মনের ভিতরের কথা ভিতরে রেখে দিয়েছি।’
‘তাই, তুমি তো দেখি অনেক বুদ্ধিমতী। এবার তাহলে সৃজা বল, তুমি বড় হয়ে কী হবে?’
‘আমিও কিছু বলব না। শ্রেষ্ঠা যা বলেছে, আমি তাই বললাম।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘তোমরা তো যমজ? তোমাদের স্কুলে মনে হয় আর যমজ কেউ নেই, তাই না?’
শ্রেষ্ঠা বলল, ‘হ্যাঁ।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘শোনো, তোমাদের দেখে আমার একটি ঘটনার কথা মনে পড়েছে। ঘটনাটি হলো- যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের নিধাম এলাকার পোলার্ড মিডল স্কুলে অষ্টম শ্রেণির গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে দেখা যায় ২৩ জোড়া বা ৪৬ যমজ। আরও একজন ছাত্রী আছে যমজ, কিন্তু তার ভাই পড়ে অন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তাই তোমায় জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের স্কুলে কতজন যমজ।’
সৃজা বলল, ‘বলে কী! সত্যি ঘটনা!’
বৃদ্ধা বললেন, ‘হ্যাঁ, সত্যি ঘটনা। এবার বল, ভবিষ্যতে কী হবে বলে মনে মনে ঠিক করে রেখেছ?’
শ্রেষ্ঠা বলল, ‘ধরে নিতে পারেন।’
অনিক বলল, ‘শুনুন, আমি কী হব জিজ্ঞেস করলেন না তো!’
বৃদ্ধা বললেন, ‘আচ্ছা, বল কী হবে?’
অনিক বলল, ‘আমি একজন উপকারী মানুষ হব। সবার উপকার করব।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘এটা কোনো কথা! পড়ালেখা করে মানুষ কি না কি হতে চায় আর তুমি ভালো হতে চাও। পেশা কী হবে তোমার! মানুষের তো পেশার পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়া যায়। অন্যের উপকার করা যায়। তুমি কি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নাকি ব্যারিস্টার বা বিজ্ঞানী, নাকি ব্যবসায়ী হবে? এখন প্রযুক্তির যুগ। পৃথিবীর মানুষ কত এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের তো তেমন বিজ্ঞানী তৈরি হচ্ছে না। তোমরা কি বিজ্ঞানী হতে পার না?’
শ্রেষ্ঠা আর সৃজা দুজন একে অপরের দিকে তাকাল। ওদের মনের কথা ওরা বুঝতে পেরেছে। ওরা যে দুই বোন বিজ্ঞানী হতে চায় তা শুধু ওরা দুজনই জানে। আর কাউকে বলেনি। বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য পড়ালেখা গভীর মনোযোগ দিয়ে করতে হবে। পড়ালেখা করে বিজ্ঞানী হওয়া যায়।
অনিক বলল, ‘কী রে, তোর দুই বোন কী ভাবছিস? সেদিন ক্লাসে যে আমরা বড় হয়ে কে কী হতে চাই, সবারটা প্রকাশ করলাম। কিন্তু তোরা দুজন তো প্রকাশ করলি না। তোদের দুই বোনের কি কোনো লক্ষ্য নেই?’
শ্রেষ্ঠা আরিত্রিকা বলল, ‘সবার জীবনেই লক্ষ্য আছে। তাই আমাদেরও আছে। এখন কিছু বলতে চাই না। আমাদের একই লক্ষ্য।’
অনিক বলল, ‘তোরা দুই বোন আমাদের ক্লাসের ভালো ছাত্রী। শুধু ক্লাস বললে ভুল হবে, তোরা তো দুজন স্কুলের সেরা ছাত্রী। তাই তোদের কিন্তু অনেকেই অনুকরণ করে। তাদের আবার প্রতিযোগী হিসেবে ভাবিস না।’
সৃজা বলল, ‘তা ঠিক আছে। আমি মিথ্যা কথা বলতে পছন্দ করি না। এখন বললে যদি পরবর্তী সময়ে হতে না পারি, তাহলে অনেকে আমাদের মিথ্যুক মনে করবে। তাই বলব না।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘শোন, তোমরা বল বা না বল, আমি তোমাদের একটি কথা বলতে চাই।’
ওরা তিনজন একসঙ্গে বলে উঠল, ‘কী কথা?’
এই যে তথ্য-প্রযুক্তির যুগে দিনকে দিন মানুষের পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, উন্নতি করছে। এটা কীসের জন্য পারছে? একমাত্র পড়ালেখা করে এবং তোমাদের বিজ্ঞানী হতে হবে। এমন কিছু আবিষ্কার করতে হবে, যা সারা পৃথিবীর মানুষের উপকারে আসতে পারে।’
বৃদ্ধার কথা শুনে ওরা অবাক হলো। ওরা দুজন ভাবছে- তিনি তো আমাদের মনের কথা বলেছেন। আমরা যমজ দুই বোন মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।
গল্পে গল্পে স্কুল পর্যন্ত এসে পৌঁছল সবাই। স্কুলের মাঠে ঢোকার আগে বৃদ্ধা বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। ওরা স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞা নিয়ে ক্লাসরুমে ঢুকে গেল।