লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার শিববাড়ী গ্রামের কৃষক বিপুল চন্দ্র গতকাল বাইসাইকেলের পেছনে এক বস্তা ডিএপি সার নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। সারের বস্তাটি তিনি ২১০০ টাকায় কিনেছেন। অথচ সরকারি বিক্রয়মূল্য ১ হাজার ৫০ টাকা। বিপুলের মতো দেশের অন্য জেলাগুলোর কৃষকদেরও এখন দ্বিগুণ দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। কৃষকরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। তারা বলছেন, সার কিনতে গেলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সার সংকটের কথা বলছেন। কিন্তু দাম বেশি দিলেই সার পাওয়া যাচ্ছে।
এখন বোরো ধান চাষের ভরা মৌসুম। কিন্তু কৃষকরা স্বস্তিতে নেই, কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ। ফসল উৎপাদনে প্রয়োজনীয় সারের সংকটে তারা দিশাহারা। সংকটের কারণে এরই মধ্যে এলাকাভেদে সারের দাম বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আশঙ্কার বিষয় হলো- বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে সারের দাম আরও বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় সচ্ছল কৃষকরা সারের আগাম মজুত করছেন। এতে বাজারের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। অবস্থাসম্পন্ন কৃষকরা কিছুটা সার পেলেও প্রান্তিক কৃষকরা একদমই সার পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সময় সারের সংকট হলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং উৎপাদনও কমবে। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের রাসায়নিক সার কারখানাগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়িয়ে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ রাসায়নিক সারের ৭০ শতাংশের বেশি ব্যবহৃত হয় বোরো ও রবি মৌসুমে। আর সময়মতো সার না পেলে খাদ্য সংকটের শঙ্কা আছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সারের কোনো সংকট নেই। কোথাও যানবাহনের কারণে সার পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। কোথাও হয়তো কেজিতে সর্বোচ্চ ৫ টাকা পর্যন্ত সারের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।
সারের সংকট নেই বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক (সরেজমিন উইং) মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল।
তিনি বলেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। আমদানিকৃত সার সমুদ্রপথে আসতে যে সময় লাগে সেটা ছাড়া সার নিয়ে কোনো সংকট নেই। সারের ডিলার ও ব্যবসায়ীরা বলেন, বরাদ্দ কম পাওয়ায় চাহিদা বেড়ে গেছে। ফলে দাম কিছুটা বাড়ছে। আর কৃষকদের অভিযোগ, অনেক ডিলারের কাছে ডিএপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও যাদের কাছে আছে তারা ১ হাজার ৫০ টাকার ডিএপি সারের বস্তা প্রতি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা নিচ্ছেন। অন্যান্য সারেও আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত মূল্য।
লালমনিরহাটের বাজার ঘুরে দেখা গেছে অপেক্ষাকৃত অবস্থাবান কৃষকরা সার ডিলারদের কাছ থেকে ২০ থেকে ৩০ পার্সেন্ট সার সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তবুও বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দরে। প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরা ছিটেফোঁটা সার কিনতে পারেননি। কৃষকরা জানান, তাদের প্রয়োজন ২০ বস্তা দিচ্ছে ২ বস্তা। টিএসপি বাজারে নেই। ডিএপির দাম বেশি। দিনে সার নেই, রাতে আছে। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হামিরকুৎসা ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার নুরুল ইসলাম সরদার। ফেব্রুয়ারি মাসে সরকারিভাবে তার সরদার এন্টারপ্রাইজের নামে বরাদ্দ হয়েছে দুই মেট্রিক টন টিএসপি, ১৯ মেট্রিক টন ডিএপি ও ১১২ মেট্রিক টন ইউরিয়া।
এ ছাড়া বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আমদানিকারকদের মাধ্যমে পেয়েছেন টিএসপি ১১ মেট্রিক টন, ডিএপি ১৮ মেট্রিক টন ও এমওপি ১১ মেট্রিক টন। মাসের শুরুতে এসব সার তার গুদামে থাকার কথা। কিন্তু মাসের ১২ তারিখেও তিনি এসব বরাদ্দের সার তুলতে পারেননি।
ফলে কৃষকরা এসে ঘুরে যাচ্ছেন। রংপুর নগরীর অদূরে মহব্বত খাঁ এলাকার কৃষক সিরাজুল ইসলাম, আরাজিগুলাল বুদাই এলাকার বোরো চাষি মেজবাহুল হক জানান, আগাম বোরো ধানের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ দিন হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সারের প্রয়োজন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সরকারি দামের চেয়ে এক থেকে দেড়শ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সার ডিলাররা সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে প্রতি বস্তায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বেশি আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আকবর হোসেন বলেন, জেলায় ১৮ হাজার ৮৬০ মেট্রিক টন সারের প্রয়োজন। এর মধ্যে বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ৬ হাজার ৭৯ মেট্রিক টন। এ জন্য কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
লালমনিরহাট জেলার সার ব্যবসায়ী আশরাফ আলী লাল বলেন, ‘আমার প্রতিদিনের চাহিদা যদি ১ হাজার বস্তা হয়, আর বরাদ্দ যদি ১০ বস্তা দেয় তবে আমি কোথায় পাব?’
(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর , চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও লালমনিরহাট প্রতিনিধি)