লিবিয়ায় দালালের নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে রাকিব মহাজন (২০) নামে বাংলাদেশি এক যুবকের। তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা গ্রামের নাজিম উদ্দিন মহাজনের ছেলে। রাকিব উন্নত জীবনের আশায় ইতালি পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন। দালালের খপ্পরে পড়ে দীর্ঘ তিন বছর লিবিয়ার বন্দি শিবিরে দালাল চক্রের অমানবিক নির্যাতনে মঙ্গলবার রাতে মারা যান তিনি। বুধবার রাতে মৃত্যুর খবর পেয়ে নিহতের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। অপরদিকে মৃত্যুর বিষয়টি জানার পর দালাল ও তার পরিবার বাড়ি থেকে পালিয়েছে। পরিবারের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তিন বছর আগে মাদারীপুর সদর উপজেলার মৃত ফটিক মৃধার ছেলে জাহাঙ্গীর মৃধার প্রলোভনে পড়েন রাকিব। জাহাঙ্গীর তার ভায়রা শরীয়তপুরের পালং থানার ধানুকা ইউনিয়নের ছোট বিনোদপুর গ্রামের সোহাগ মাতুব্বরের মাধ্যমে ২৭ লাখ টাকায় ইতালিতে পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি করে। ওই টাকা দিয়ে তিন বছর আগে রাকিব পাড়ি জমান লিবিয়া। কিন্তু লিবিয়ার নেওয়ার পর বন্দি শিবিরে আটকে রেখে আরও টাকার জন্য নির্যাতন চালাতে থাকে সোহাগ মাতুব্বর। পরে রাকিবের বাবা নাজিম উদ্দিন ধারদেনা করে আরও ৫ লাখ টাকা দেন সোহাগকে। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। লিবিয়ায় দুই বছর চার মাস অসহ্য যন্ত্রণা-নির্যাতন সহ্য করে কাটিয়েছেন রাকিব।
জানা যায়, দুই বছর চার মাস পর সোহাগের বন্দি শিবির থেকে বেরিয়ে আরেক দালাল সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের ব্রাহ্মন্দী গ্রামের মাজেদ খলিফাকে ধরে রাকিবের পরিবার। তাকেও ৮ মাস আগে ১৫ লাখ টাকা দেয় ইতালি পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু সেও টাকা নিয়ে নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে রাকিব গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে লিবিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়ার পর মঙ্গলবার রাতে মৃত্যু হয় রাকিবের। তার মৃত্যুর খবর দালাল মাজেদ খলিফাই রাকিবের পরিবারকে জানায়। নিহত রাকিবের বাবা নাজিম উদ্দিন জানান, ‘দফায় দফায় টাকা দিয়ে আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। এ পর্যন্ত সোহাগ আর মাজেদকে ৪৫ লাখ টাকা দিয়েছি। তার পর এখন আমার ছেলের মৃত্যুর খবর শুনতে হলো। আমার ছেলেকে না খাইয়ে মেরে ফেলছে। কয়েকদিন আগেও আমার ছেলে ভিডিওতে তার নির্যাতনের কথা বলেছে। আর বাঁচার জন্যে আকুতি করেছে। কিন্তু আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না। নিহতের ছোট চাচা শাহজালাল বলেন, ‘নির্যাতন করে আমার ভাতিজাকে হত্যা করেছে। এখন দালালরা বলে অসুস্থ হয়ে রাকিব মারা গেছে। আমরা এ হত্যার বিচার চাই। এভাবে যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়। অভিযোগের বিষয় স্থানীয় দালাল জাহাঙ্গীর মৃধা বলেন, সোহাগ আমার ভায়রা বিধায় আমাকে জড়ানো হচ্ছে। কেউ বলতে পারবে না যে, আমি তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি। আর ওই ছেলে অসুস্থ হয়ে লিবিয়ায় মারা গেছে। আমার ভায়রা বরং সেখানে ট্রিটমেন্ট করেছে। এর বেশি কিছু জানি না। অপরদিকে মাজেদ খলিফার বাড়িতে কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা বলেছেন, মৃত্যুর বিষয়টি জানার পর তার পরিবার বাড়ি থেকে পালিয়েছে। মাদারীপুর জেলা পুলিশের তথ্য মতে, গত বছর লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে মাদারীপুর জেলার অন্তত শতাধিক মানুষ মারা গেছে। এরই মধ্যে ৫ শতাধিক দালালের বিরুদ্ধে ৩৫০টি মামলা দায়ের হয়েছে; কিন্তু মামলায় জামিন পেয়ে আবার দালালিতে যুক্ত হয় তারা। পুলিশ সুপার মো. সাইফুজ্জামান বলেন, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। আমরা জেলা পুলিশ এসব বিষয়ে জিরো টলারেন্সে আছি।