আমন ধানের ভরা মৌসুমে সংকট না থাকলেও বগুড়ায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে চালের দাম। ১৫ দিনের ব্যবধানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৮ টাকা। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চিকন চালের দাম। বগুড়ার বাজারে কাটারিভোগ চাল বিক্রি হচ্ছে ৭৬ থেকে ৭৮ টাকা কেজি; যা কয়েক দিন আগেও ছিল ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে ধানের দাম বেশি, উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়া, হাটবাজার-সড়কে অব্যাহত চাঁদাবাজি, আমদানি করা চাল না আসা, হাতবদল, সরকারি মজুত কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে চালের দাম বেড়েছে। এদিকে দফায় দফায় চালের দাম বাড়ায় বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ।
বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. রিয়াজুর রহমান রাজু জানান, সম্প্রতি অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে আমনের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাজারে চালের দাম বাড়ার এটি একটি বড় কারণ। আমন ধান উৎপাদনের দ্বিতীয় প্রধান মৌসুম। দেশে কোনো মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হলে চালের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এ ছাড়া চালের উৎপাদন খরচ বাড়ায় ধানসহ চালের দামও বেড়েছে। সরকারি তথ্যমতেই সম্প্রতি বিভিন্ন কারণে চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১২ শতাংশ। পরিবহন খরচও বেড়েছে। কৃষিশ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। বেড়েছে কৃষি যন্ত্রপাতির দাম। বেড়েছে সার, কীটনাশকের দামও। আরও বেড়েছে খেতে পানি সরবরাহ দেওয়ার ডিজেল-কেরোসিন ও বিদ্যুতের দাম। তা ছাড়া সার্বিকভাবে বেড়েছে জীবনযাত্রার মান। এসব কারণে চালের দাম বেড়েছে। কারণ কৃষককে ধান বা চাল বিক্রি করেই সারা বছর জীবন চালাতে হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের নানামুখী উদ্যোগেও কমেনি চাঁদাবাজি। হাতবদলের পরে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন চাঁদাবাজরা। যার প্রভাব পড়ছে বাজারগুলোয়। ফলে বাড়ছে চালের দাম। জানা যায়, হাসিনা সরকারের পতনের পর মাসখানেক বন্ধ থাকলেও চাঁদাবাজরা ভোল পাল্টে আবার মাঠে সক্রিয় হয়েছে। ফলে চালসহ প্রায় সব ধরনের পণ্যেই এর প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, একজন ব্যবসায়ীকে হাটে, বাজারে, সড়কে, মহাসড়কে, আড়তে, পাইকারি বাজারে, খুচরা বাজারে এবং মহল্লার দোকানে পর্যন্ত বিভিন্ন কায়দায় চাঁদা দিতে হচ্ছে।
বগুড়া শহরের কলোনি বাজারের আশরাফ চাউল ঘরের স্বত্বাধিকারী আবদুর রশিদ জানান, ‘বাজারে ঊনপঞ্চাশ চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি; যা ১৫ দিন আগে ছিল ৫৫ টাকা। রণজিৎ চাল ৫৬ টাকা কেজি। আগে ছিল ৫৪ টাকা। আটাশ চাল ৬৫, কাটারিভোগ ৭৬ থেকে ৭৮ টাকা; যা আগে ছিল ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। তবে পোলাওর চাল আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। বগুড়া সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হারুন-উর-রশিদ জানান, বগুড়ায় সরকারি দামের তুলনায় বাজারদর বেশি হওয়ায় গুদামে আমন ধান দিতে আগ্রহ নেই কৃষকের। আমন মৌসুমে বগুড়া জেলায় সরকারিভাবে আমন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ১২ হাজার টন। এ পর্যন্ত কেনা হয়েছে ৮১ টন। কৃষক বাজারে বেশি দামে ধান বিক্রি করছেন; যার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে।
বাজার পর্যবেক্ষকরা জানান, কৃষকের মাঠ থেকে খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ভোক্তার হাতে চাল তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েক স্তরে হাতবদল হয়। প্রতি স্তরেই মুনাফা লাভের কারণে সার্বিকভাবে বেড়ে যায় চালের দাম। সরকারের কোনো উদ্যোগেই হাতবদলের এ স্তর সংখ্যা কমানো যাচ্ছে না। কৃষকের গোলার ধান মিলারদের কাছে যায়। সেখান থেকে মোকামের আড়তদার, তারপর হাতবদল হয়ে পাইকারি বাজারের আড়তদার, সেখান থেকে খুচরা ব্যবসায়ী হয়ে ভোক্তার হাতে পৌঁছে চাল। প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবহন খরচসহ প্রতি স্তরেই কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা মুনাফা ধরে হাতবদল হওয়ার কারণে বগুড়ায় প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।