জুলাই-আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বেড়েছে নানা ধরনের অপরাধ। নতুন নতুন খাত এবং মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এসব অপরাধে জড়াচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এবং তরুণরা। দিনদিন বাড়ছে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং বাসাবাড়ি লুট।
১৯ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার পাকাপুলে রূপালী ব্যাংকের একটি উপশাখায় ব্যাংক কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের জিম্মি করে ডাকাতির চেষ্টা করে এক তরুণ ও দুই কিশোর। নানা নাটকীয়তার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের আত্মসমর্পণ করান। এরা হলেন লিয়ন মোল্লা ওরফে নীরব (২২) এবং অন্য দুজন কিশোর। তাদের বয়স আনুমানিক ১৬। লিয়ন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার কুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা কবির মোল্লার ছেলে। আর দুই কিশোরের বাড়ি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কদমতলী খালপাড় এলাকায়। লিয়ন পেশায় গাড়িচালক। বাকি দুজনের একজন একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী, আরেকজন মাদরাসার শিক্ষার্থী। তারা সিনেমা দেখে ডাকাতির পরিকল্পনা করে বলে পুলিশের তাৎক্ষণিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়। এদিকে রাজধানীর আদাবরে একটি বাসার লকার ভেঙে ৪৫ ভরি সোনা লুট হয়। লুট হওয়া অলংকারের মধ্যে ৩২ ভরি উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মাহিন ও রেহান নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম জাকারিয়া জানান, শুক্রবার রাতে আদাবর ১৬ নম্বর রোডের একটি বাসার লকার ভেঙে ৪৫ ভরি সোনা লুট হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাদী হয়ে মামলা করেন। এরপর থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করে। একই এলাকার মেহেদীবাগে শুক্রবার সন্ধ্যায় মহড়ায় বাধা দেওয়ায় দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এলাকাবাসীর ওপর হামলা করে কিশোর গ্যাং চক্রের কয়েক শ সদস্য। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করে। সূত্র জানান, কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহ এ হামলা ঘটনার নেপথ্যে আদাবর এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও কিশোর গ্যাং চক্রের প্রধান সুমন ওরফে ডিবি সুমন। তিনি একসময় স্থানীয় ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসু ও কাসুর কিশোর গ্যাং বাহিনীর প্রধান ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হাসু ও কাসু পালিয়ে যাওয়ায় তাদের অনুপস্থিতিতে বিএনপির এক নেতার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে কিশোর গ্যাংটি। এ ঘটনায় আহত মশিউর রহমান মুন্নার ছেলে বাবু বলেন, ‘শুক্রবার রাতে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েক শ সদস্য হঠাৎ দেশি ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আতর্কিত হামলা করে। এ হামলায় আমার বাবা গুরুতর আহত হন। বাবা একজন সিএনজি চালক।’ বছর দুয়েক আগে নারী পাচারে তরুণদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে এলে তা নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়। তখন বলা হয়, অনলাইন বিনোদনভিত্তিক অ্যাপ টিকটকের আড়ালে অপরাধ ও অনৈতিক কর্মকাে জড়াচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। ২০২১ সালে রাজধানীর এক তরুণীকে প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচারের পর নির্মম নির্যাতনের ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পুলিশের তদন্তে এ ঘটনার হোতা হিসেবে উঠে আসে টিকটক হৃদয় বাবুর নাম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে ২৩৭টির মতো কিশোর গ্যাং রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকায় ১২৭টি। এর সদস্য ১ হাজার ৩৮২ জন। চট্টগ্রামে রয়েছে ৫৭টি। এর সঙ্গে জড়িত ৩১৬ জন। শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম নয়, গাজীপুর ও খুলনা মহানগরী এলাকায়ও বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে; যারা খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে। নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ-মারামারিতে জড়াচ্ছে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা। জেলা শহরগুলোতেও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ছে। এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছেন, ঢাকায় অপরাধমূলক কর্মকাে জড়িতদের ৪০ শতাংশই কিশোর। ১৮ ডিসেম্বর রাতে সায়েদাবাদে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে কামরুল হাসান (২৩) নামে এক যুবক নিহত হন। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদেরও বয়স ১৮ বছরের কম। ওই ছিনতাইয়ের ঘটনার দুই দিন পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মফিজুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ছিনতাইকারী রোহান তার হাতে থাকা ধারালো চাকু দিয়ে কামরুলের বুকে আঘাত করে।’
জানা যায়, ১৫ ডিসেম্বর মগবাজারে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আহত হাবিবুল্লাহ (১৮) নামে এক কিশোর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এ ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও জড়িত ছিল কিশোর গ্যাং সদস্যরা। ৫ আগস্টের পর শুধু রাজধানীর মোহাম্মদপুরেই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে ১০ জন খুন হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশের বেশির ভাগ পরিবারের সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের তেমন মনোযোগ নেই। সন্তানকে সময় দেওয়াটা জরুরি। তার সঙ্গে গল্প করা, তার মনের অবস্থা বোঝা। অভিভাবকদের সঙ্গে সন্তানদের বন্ধন খুবই জরুরি।’