জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিচার, সংস্কার এবং গণপরিষদ নির্বাচন আদায়ের জন্য আমরা সম্মিলিতভাবে দ্রুতই আবার রাজপথে নামব। গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দলের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে তিনি এ কথা বলেন। জুলাই গণ অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারগুলোর সম্মানে এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা তার জন্য আমরা কারও ওপর নির্ভর হতে চাই না। সে আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমরা নিজেরাই মাঠে নেমেছি। রাজনৈতিক দল গঠন করেছি। আমাদের এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি দাবি হচ্ছে বিচার ও সংস্কার। ৫ আগস্ট-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের যে সরকার গঠিত হয়েছে এবং যাঁরাই সামনে রাজনীতি করতে যাচ্ছেন, তাঁদের সবার ন্যায্যতার ভিত্তি হচ্ছে এই আহত যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারবৃন্দ। ফলে তাদের মনের আকাঙ্ক্ষাটা আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে। শত শত মামলা হয়েছে। শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা মামলা করেছেন। আওয়ামী লীগের খুনিদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। তাদের বিচার করা ছাড়াই যদি নির্বাচনের মাধ্যমে আরেকটা সরকার ক্ষমতায় চলে আসে, তাহলে কী নিশ্চয়তা আছে যে আওয়ামী লীগকে আবার পুনর্বাসিত করা হবে না এই বাংলাদেশে? আমরা মনে করি ৫ আগস্ট বাংলাদেশের জনগণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের রায় দিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট রাজনীতির আর জায়গা হবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে, আমরা নাকি নির্বাচন পেছানোর রাজনীতি করছি।
যারা এই অভিযোগ করছে তাদেরকে আমরা পাল্টা বলে দিতে চাই, আপনারা বিচার ও সংস্কার পেছানোর রাজনীতি করবেন না। বিচার ও সংস্কারের প্রতি ঐকমত্য পোষণ করুন, নির্বাচন আমরা আপনাদেরকে করে দিতে সহায়তা করব। সরকারকে বলব, দ্রুত বিচার ও সংস্কারের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আমরা আমন্ত্রণ জানিয়ে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করেছিলাম। তিনিসহ অন্যান্য উপদেষ্টা এবং সেনাপ্রধান প্রত্যেকেই আমাদের কাছে অঙ্গীকার করেছিলেন, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং বিচারের দায়িত্ব আপনারা নিচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে এবং সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে আওয়ামী লীগের ফয়সালা কী হবে। আমরা করায়-গণ্ডায় জবাবদিহি নেব যে আমাদের বিচার ও সংস্কার কতটুকু আদায় হলো।’
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘আমরা কেউ নির্বাচনের বিরুদ্ধে না। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব বলে আমরা নিজেরা একটা রাজনৈতিক দল গঠন করেছি। আমরা বলেছি গণপরিষদ নির্বাচন। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বর্তমান ফ্যাসিস্ট সংবিধান অকার্যকর ও ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে আমরা একটি নতুন সংবিধান এই জাতিকে উপহার দিয়ে যাব ইনশাল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘মব কালচারের রাজনীতি তৈরি করে বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমরা এসব ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করব। বিচার, সংস্কার এবং গণপরিষদ নির্বাচন আদায়ের জন্য আমরা সম্মিলিতভাবে খুব দ্রুতই আবার রাজপথে নামব।’
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘আমার ভাইদেরকে যারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে, গুলি করেছে, আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে সেসব খুনিদের বিচার আমরা বাংলার মাটিতে দেখতে চাই। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি জানাই, এসব খুনের হুকুমদাতা খুনি হাসিনাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনার বিচার করতে হবে।’
শহীদ জাবীর ইব্রাহিমের বাবা নওশের আলী বলেন, ‘এনসিপির কাছে শহীদ ও আহত পরিবারের জোর দাবি আগে বিচার করতে হবে। আমরা বিচার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন চাই না। আগে বিচার হবে তারপর সংস্কার হবে।’
আশুলিয়ার শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের মা বলেন, ‘আমার সন্তানকে কেন হত্যা করা হলো? এর বিচার না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হবে না। আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই।’
এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা প্রমুখ। অনুষ্ঠানে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।