যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় ইনিংসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেকের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সামনে এখন নানা পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে বৈশ্বিক রাজনীতি ও নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যা বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের জীবনে ফেলবে নতুন প্রভাব। সূত্র : এএফপি, রয়টার্স, বিবিসি, দ্য ইকোনমিস্ট।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের অভিষেকের মাধ্যমে এশিয়া মহাদেশে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নতুন অধ্যায়ের মাত্রা পেতে যাচ্ছে। বিশেষ করে চীন ও আঞ্চলিক মিত্রদের বিষয়ে এ নীতি নতুন দিকনির্দেশনা পেতে যাচ্ছে। আর এর মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে মার্কিন স্বার্থ ও শক্তিমত্তা। অর্থনৈতিক বিভাজন, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন, ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জোটের বোঝা হয়ে যাওয়া বিষয়গুলো ভাগাভাগি করে নেওয়ার মতো প্রসঙ্গ এক্ষেত্রে গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে। তবে এ পরিবর্তন এ অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যকে নতুন করে বিশ্লেষণ ও বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মতো বিষয়গুলোকে নতুন মাত্রা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে কোরীয় উপদ্বীপ বা দক্ষিণ কোরিয়া আলাদা গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে। সম্পর্ক রক্ষার এ চ্যালেঞ্জে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কোরীয় নীতিনির্ধারকদের কাজ করতে হবে সিউলের কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও কীভাবে বাড়ানো যায়, সে প্রসঙ্গগুলোকে ঘিরে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতায় উত্তাল দক্ষিণ কোরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ২০২৫ সালের প্রথমভাগেই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত চার দশকের মধ্যে এবারই প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট খোলাখুলিভাবে আইন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছেন। তবে গণতন্ত্র রক্ষার সব রকম প্রচেষ্টা সেখানে চলছে। আর এমন একটা সময়ে এসব ঘটনা ঘটছে, যখন উত্তর কোরিয়া ইউক্রেনে তার শক্তি প্রদর্শন করতে মরিয়াভাব প্রকাশ করছে, রাশিয়ার সঙ্গে সৌহার্দ্য বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসন। তবে জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোন ক্ষেত্রগুলো আলোচিত হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ট্রাম্প প্রশাসনকে। এক্ষেত্রে ইউএস স্টিল ও জাপানের নিপ্পন স্টিলের একীভূতকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, জাপানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির ওপর জাপানের নিয়ন্ত্রণ না থাকা। এক্ষেত্রে ক্রমশ আগ্রাসী হতে থাকা চীনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে জাপানের ভূমিকা কী হতে পারে, সে বিষয়ে সহযোগিতা আরও নিবিড় করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এ ছাড়া জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেটের বিষয়টি নিয়েও একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। দেশটি তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে চায়। এই বরাদ্দ জিডিপির দুই শতাংশ করতে চায় তারা। তবে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, এই বরাদ্দ ৩ শতাংশ করাটা হবে বেশি যুক্তিযুক্ত। এই সঙ্গে চীনের প্রতি ট্রাম্পের কঠোর মনোভাব আরও তীব্র হতে পারে। তিনি চীনা পণ্যের ওপর ৬০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলেছেন। ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ একদিনেই শেষ করতে চেয়েছেন। তিনি ইউক্রেনকে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার সমালোচনা করেছেন। তিনি হয়তো এখন ইউক্রেনকে আঞ্চলিক সমঝোতা করতে চাপ দিতে পারেন। এ ছাড়া ট্রাম্প ন্যাটো নিয়েও সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। তিনি ইউরোপীয় সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার দাবি জানিয়েছেন। যদিও তিনি ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের কথা স্পষ্ট করেননি। তবে তিনি ইউরোপে মার্কিন সেনাদের সংখ্যা কমিয়ে ন্যাটোকে দুর্বল করে দিতে পারেন। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্প ইসরায়েলপন্থি অবস্থান ধরে রাখলেও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ভিত্তিতে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে চুক্তি করার চেষ্টা করতে পারেন। ইরানের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকতে পারে। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক প্রতিরোধ জারি করতে পারেন।
জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ট্রাম্প আবার প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিতে পারেন ও জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। তিনি সবুজ শক্তির জন্য আর্থিক প্রণোদনা কমানো ও তেল এবং গ্যাস ড্রিলিং বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা বৈশ্বিক জলবায়ু প্রচেষ্টাকে ধীর করতে পারে। অভিবাসন নিয়ে ট্রাম্প লাখ লাখ অনথিভুক্ত বা অবৈধ অভিবাসীকে বিতাড়িত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের কথা বলেছেন। তাঁর পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিতর্কিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল ও সীমান্ত নিরাপত্তা কঠোর করা। এ ছাড়া ট্রাম্প কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কথা উল্লেখ করে গ্রিনল্যান্ড কেনার এবং পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কয়েক দশক ধরেই মার্কিন নেতারা যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, তাঁদের ক্ষমতার উৎস হলো বিশ্বকে অনেক বেশি স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ডিফেন্ডার হওয়ার দায়িত্ববোধ ও গণতন্ত্রের প্রতি যত্নবান হওয়া। ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই মূল্যবোধ খাদে ফেলে দেবেন এবং ক্ষমতাকে ব্যবহার-কেন্দ্রীভূতে বেশি মনোযোগ দেবেন। তিনটি সংঘাতে তার দৃষ্টিভঙ্গি পরীক্ষিত ও সংজ্ঞায়িত হবে। সেগুলো হলো মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন ও চীনের সঙ্গে আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধ।