প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেছেন, আমাদের অঙ্গীকার হচ্ছে একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া, যা থেকে জাতি এতদিন বঞ্চিত হয়েছে। আগামী (ত্রয়োদশ) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাগরিকরা যাতে অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেই লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। গতকাল একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ভোটার হালনাগাদ কর্মসূচি-২০২৫ উপলক্ষে আগারগাঁওয়ে নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আগামী ২০ জানুয়ারি থেকে। সেই লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের ‘প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ অনুষ্ঠান গতকাল উদ্বোধন করা হয়। ধাপে ধাপে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর পৌনে ১ লাখ জনবল তৈরি করা হবে এ কর্মসূচির আওতায়। সিইসি ছাড়াও প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ, বেগম তাহমিদা আহমদ, আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং ইসি সচিব আখতার আহমেদ। সিইসি বলেন, আমি প্রায়ই বলি, আমাদের যারা বঞ্চিত কর্মকর্তা, তারা জনপ্রশাসনে যাচ্ছে, আন্দোলন করছে, তাদের বঞ্চনার তথ্য তুলে ধরছে; দেশের ১৮ কোটি বঞ্চিত মানুষ কোথায় যাবে। ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত ১৮ কোটি মানুষ। তারা আসবে আমাদের কাছে। তাদের এ বঞ্চনার দুঃখ শোনার জন্য আমরা আছি। তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নিয়েছি, ইনশাল্লাহ তাদের (নাগরিকদের) বঞ্চনা যেন ঘোচাতে পারি।
তারা যে বঞ্চিত হয়েছে, যে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে- তা ঘোচাতে চাই। বঞ্চনার কষ্ট দূর করতে চাই। আমাদের কমিটমেন্টে অটল আছি। সবার সহযোগিতা চাই।
নাসির উদ্দীন বলেন, ক্রিটিক্যাল টাইমে নতুন সরকার ক্ষমতা নিয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে; আমরাও ক্রান্তিকালীন সময়েরই একটা নির্বাচন কমিশন। দায়িত্ব ছাড়াও দেশবাসীর প্রত্যাশা সরকারের কাছেও বেশি, আমাদের কাছেও বেশি। ১৫টি সংস্কার কমিশন হয়েছে। অতীতকে বদলে বর্তমান বিদ্যমান চাহিদার সঙ্গে খাপ খায় এমন সংস্কার যাতে হয়, পুনর্গঠিত হয়। সংস্কার প্রতিবেদন অনুযায়ী আইন-কানুনে বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতে হবে; সেই লক্ষ্যে কাজ করছি। সব সংস্কারের বড় সংস্কার ‘নিজের আত্মাকে’ সংস্কার করা মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘মন মগজ সংস্কার না হলে আখেরে ভালো কিছু বয়ে আনবে না। আমাদের মন-মানসিকতায় সংস্কার আনতে হবে।’
১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের সংস্কার কাজের অনেক কিছুই বাস্তবায়ন না হওয়ার কথাও তুলে ধরেন সিইসি নাসির। তিনি বলেন, এবার তো আমাদের চারদিকে যে চিন্তাভাবনা দেখছি; যে প্রেসার, রিফর্মস মানে রিফর্মস প্রপোজাল নয়। এগ্রিড প্রপোজালগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকারের তরফ থেকে উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি। সরকার চাচ্ছে- যেগুলোতে ঐকমত্য হবে, সেগুলো মোটামুটিভাবে যাতে অধিকাংশ বাস্তবায়ন করা যায়- সেজন্য কাজ করছে। আমাদের এখানেও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন রয়েছে। তারা যে সুপারিশ দেবে, তাতে আমাদের বিধিবিধান, আইন-কানুনে পরিবর্তন আনতে হবে।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অনেকটাই পূর্বশর্ত। ভোটার তালিকা যত সুষ্ঠু হবে, নির্বাচন ততটাই গ্রহণযোগ্য হবে।
নির্বাচন কমিশনার বেগম তাহমিদা আহমদ বলেন, জাতির বহুল আকাক্সিক্ষত, প্রত্যাশিত নির্বাচনের বিষয়ে আমাদের অনেকের মধ্যে সংশয় আছে যে, আমরা এটি সুষ্ঠুভাবে পারব কি না। তবে আমি আশাবাদী কারণ আমরাই ১৫ বছর আগে চার-চারটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দিয়েছি। গত যে টার্মগুলোতে আমরা পারি নাই, কারণ কর্তার ইচ্ছায় কর্ম হয়েছে। রাজা চেয়েছে- তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই। তাই আমরা সবাই সেই সোনার হরিণ ধরার জন্য ছুটে বেড়িয়েছি। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কর্তাও নেই, রাজাও নেই, আমরা সবাই রাজা। আর আমাদের রাজা হচ্ছে- আমাদের আইন-কানুন, বিধি-বিধান, সর্বোপরি আমাদের বিবেক। তাই আমি আবারও আশাবাদী আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অবশ্যই করতে পারব, জাতিকে উপহার দিতে পারব।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, এবারে নির্বাচন ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন নতুন কোনো বিষয় না হলেও আমাদের বহু চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জগুলো সামনে রেখে প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়াই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ভোটের প্রতি মানুষের অনাগ্রহ ছিল। আমরা এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। আলোচিত ছিল তরুণ ভোটারদের ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতাই না হওয়া। তারা একবারও ভোট দিতে পারেনি। আমার বিশ্বাস এ দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে একটি ভালো নির্বাচন করতে পারব।